পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ‘ভাতা’ এখন শুধুই সামাজিক সুরক্ষা নয়, তা পরিণত হয়েছে সরাসরি রাজনৈতিক অস্ত্রে। আর সেই অস্ত্রেই পাল্টা আঘাত হানার কৌশল নিয়েছে বিজেপি। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রকাশিত দলের ‘সঙ্কল্পপত্র’-এ একাধিক আর্থিক সহায়তার ঘোষণা করে কার্যত তৃণমূল কংগ্রেসের সামাজিক প্রকল্পগুলির মোকাবিলায় নামল গেরুয়া শিবির।
নিউটাউনে আয়োজিত সাংবাদিক বৈঠকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ স্পষ্ট ভাষায় জানান, ‘‘আগামী পশ্চিমবঙ্গের যে রোডম্যাপ নিয়ে এ বারের নির্বাচনে কথা হবে, আমাদের সঙ্কল্পপত্র হল তার পরিচায়ক।’’
তবে সেই ‘রোডম্যাপ’-এর মূল আকর্ষণ যে উন্নয়ন নয়, বরং সরাসরি আর্থিক অনুদান—তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ঘোষণাগুলিতে। বিশেষ করে নারী ও যুব সমাজকে লক্ষ্য করে বিজেপির প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
দ্বিগুণ ভাতার প্রতিশ্রুতি
রাজ্যের অন্যতম জনপ্রিয় প্রকল্প ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এ বর্তমানে মহিলারা মাসে ১৫০০ টাকা পান। বিজেপি জানিয়েছে, তারা ক্ষমতায় এলে সেই অঙ্ক বাড়িয়ে মাসে ৩০০০ টাকা করা হবে। একইভাবে বেকার যুবক-যুবতীদের জন্যও মাসিক ৩০০০ টাকার ভাতার ঘোষণা করা হয়েছে, যা সরাসরি ‘যুবসাথী’ প্রকল্পকে টক্কর দিচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘোষণাগুলি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করছে—তৃণমূলের জনপ্রিয় সামাজিক প্রকল্পগুলিকেই হাতিয়ার করে ভোটব্যাঙ্কে প্রভাব ফেলতে চাইছে বিজেপি।
কৃষক ও স্বাস্থ্য খাতে পাল্টা চাল
শুধু নারী বা যুব সমাজ নয়, কৃষকদের জন্যও আর্থিক সহায়তার ক্ষেত্রে নতুন সমীকরণ তৈরির চেষ্টা দেখা গিয়েছে। ‘প্রধানমন্ত্রী কিসান সম্মান নিধি’ প্রকল্পে কেন্দ্র যেখানে বছরে ৬০০০ টাকা দেয়, সেখানে রাজ্যে ক্ষমতায় এলে আরও ৩০০০ টাকা যোগ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিজেপি। অর্থাৎ মোট ৯০০০ টাকা বার্ষিক সহায়তা।
এছাড়াও রাজ্যের ‘কৃষকবন্ধু’ প্রকল্পের পরিবর্তে সকল কৃষকের জন্য নির্দিষ্ট ৯০০০ টাকার আর্থিক সহায়তার কথা বলা হয়েছে, যেখানে আর ন্যূনতম বা সর্বোচ্চ সীমার বিভাজন থাকবে না।
স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও প্রতিযোগিতা আরও তীব্র। বিজেপি জানিয়েছে, তারা ক্ষমতায় এলে ‘আয়ুষ্মান ভারত’ প্রকল্প চালু করবে, যার সুবিধা রাজ্যের বাইরে দেশের যে কোনও প্রান্তে পাওয়া যাবে। পাশাপাশি রাজ্য সরকারের অতিরিক্ত তহবিল যোগ করে বিমার পরিমাণ পাঁচ লক্ষ টাকারও বেশি করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
ভাতা বনাম উন্নয়ন—কোন পথে ভোট?
যদিও ইস্তেহারে শিল্প, পরিকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের মতো বিষয়ও রয়েছে, তবুও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে ভাতা-কেন্দ্রিক প্রতিশ্রুতিগুলিই। রাজ্য সরকারি কর্মীদের বকেয়া মহার্ঘ ভাতা ৪৫ দিনের মধ্যে মেটানো এবং সপ্তম বেতন কমিশন চালুর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে বিজেপি।
একইসঙ্গে নারী সুরক্ষা, কৃষকদের ন্যায্য মূল্য, শহর উন্নয়ন থেকে শুরু করে পর্যটন—বিভিন্ন খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে ‘সঙ্কল্পপত্র’-এ।
রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট
এই ইস্তেহার থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—পশ্চিমবঙ্গে আগামী নির্বাচনে লড়াই শুধু আদর্শ বা উন্নয়নকে ঘিরে নয়, বরং সরাসরি আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতিকে কেন্দ্র করেই ঘুরপাক খেতে পারে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার যে সামাজিক প্রকল্পগুলিকে হাতিয়ার করে জনসমর্থন গড়ে তুলেছে, বিজেপি সেই একই পথে হেঁটে আরও বড় প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে ভোটের অঙ্ক পাল্টে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এখন দেখার, এই ‘ভাতা বনাম ভাতা’ লড়াইয়ে শেষ হাসি কে হাসে।






