ভারতের গণতন্ত্রের ইতিহাসে অনেক বড় বড় নাম রয়েছে। কিন্তু এই ইতিহাসের একেবারে প্রথম পাতায় যে মানুষটির নাম লেখা, তিনি কোনও নেতা নন, কোনও বিশিষ্ট ব্যক্তিও নন। তিনি ছিলেন এক সাধারণ স্কুল শিক্ষক—শ্যাম শরণ নেগি। অথচ তাঁরই হাত ধরেই শুরু হয়েছিল বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের ভোটযাত্রা।

স্বাধীনতার প্রায় পাঁচ বছর পর, ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হয় দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন। কিন্তু তারও আগে, ১৯৫১ সালের অক্টোবরেই ভোট হয়ে যায় হিমাচল প্রদেশের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায়। কারণ, শীত পড়লে তুষারপাতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় সেই অঞ্চল। তাই আগেভাগেই নির্বাচন আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয় নির্বাচন কমিশন।
সেই সময় হিমাচল প্রদেশের কিন্নর জেলার বাসিন্দা শ্যাম শরণ নেগি ছিলেন এক স্কুল শিক্ষক। নিজের দায়িত্ব ছিল ভোট পরিচালনার কাজেও। কিন্তু তার আগে তিনি যা করেছিলেন, সেটাই ইতিহাস হয়ে যায়। ভোটের দিন ভোরের আলো ফোটার আগেই তিনি পৌঁছে যান ভোটকেন্দ্রে। নির্বাচনকর্মীদের অনুরোধ করেন, যাতে তাঁকে আগে ভোট দিতে দেওয়া হয়। কারণ, তাঁকে অন্য কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করতে যেতে হবে।

অবশেষে তিনিই দেন স্বাধীন ভারতের প্রথম ভোট। তখন তাঁর বয়স ৩৪ বছর। তিনি নিজেও জানতেন না, এই একটি ভোট তাঁকে ইতিহাসের পাতায় চিরস্থায়ী করে দেবে। তবে এই পরিচয় সামনে আসতে সময় লাগে দীর্ঘ ৫৬ বছর। ২০০৭ সালে হিমাচল প্রদেশের নির্বাচন দফতরের তৎকালীন আধিকারিক মনীষা নন্দা পুরনো নথি খতিয়ে দেখতে গিয়ে খুঁজে পান এই তথ্য। এরপরই সামনে আসে সত্য—দেশের প্রথম ভোটার শ্যাম শরণ নেগি।

তারপর থেকে তিনি হয়ে ওঠেন গণতন্ত্রের এক জীবন্ত প্রতীক। ২০১০ সালে তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার নবীন চাওলা নিজে গিয়ে তাঁকে সম্মান জানান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে গোটা দেশে। জীবনে তিনি মোট ৩৪ বার ভোট দিয়েছেন। লোকসভা, বিধানসভা কিংবা পঞ্চায়েত—কোনও নির্বাচনই বাদ যায়নি। নিজের কাজ, অসুবিধা, বয়স—কিছুই তাঁকে আটকাতে পারেনি।
তাঁর এই নিষ্ঠাই তাঁকে আলাদা করে তোলে। তরুণ প্রজন্মকে বারবার তিনি বোঝাতেন—ভোট দেওয়া শুধু অধিকার নয়, দায়িত্বও। জীবনের শেষ সময়েও সেই বিশ্বাসে অটল ছিলেন তিনি। ২০২২ সালে হিমাচল প্রদেশে নির্বাচনের আগে তাঁর শারীরিক অবস্থা ভীষণ খারাপ হয়ে যায়। প্রথমে তিনি বাড়ি থেকে ভোট দিতে অস্বীকার করেছিলেন। বলেছিলেন, তিনি ভোটকেন্দ্রে গিয়েই ভোট দেবেন। কিন্তু পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় শেষ পর্যন্ত বাড়িতেই ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
২ নভেম্বর, ২০২২—নিজের জীবনের শেষ ভোটটি দেন তিনি। আর তার তিন দিন পর, ৫ নভেম্বর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। একজন মানুষ, যিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজের নাগরিক দায়িত্ব পালন করেছেন—তাঁর চেয়ে বড় গণতন্ত্রের দূত আর কে হতে পারেন?





