ভোটের ফল প্রকাশের পর পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক মানচিত্র বদলেছে দ্রুত। কিন্তু সেই পরিবর্তনের আনন্দের পাশাপাশি সামনে এসেছে অন্য এক বাস্তব—অশান্তি। সরকার গঠনের আগেই রাজ্যের একাধিক জেলায় ছড়িয়েছে সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর এবং প্রাণহানির ঘটনা। ফলে নতুন অধ্যায়ের শুরুতেই শান্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক, একাধিক মৃত্যুর খবর। হাওড়ার উদয়নারায়ণপুরে বিজেপি কর্মী যাদব বরকে পিটিয়ে খুন করা হয়েছে বলে অভিযোগ। বিজেপির দাবি, বিজয় মিছিল থেকে ফেরার সময় তৃণমূল কর্মীরা তাঁর ওপর হামলা চালায়। এই ঘটনায় কালীপদ বাগ-সহ চারজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ, বাকিদের খোঁজ চলছে।
অন্যদিকে বীরভূমের নানুরে তৃণমূল কর্মী আবির শেখ খুন হন। পরিবারের অভিযোগ, বিজেপি কর্মীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালায়। যদিও এই অভিযোগ মানতে নারাজ বিজেপি। তাদের বক্তব্য, এটি তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ফলও হতে পারে। উত্তর ২৪ পরগনার নিউ টাউনেও তৃণমূল কর্মীদের হামলায় বিজেপি কর্মী মধু মণ্ডলের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। সব মিলিয়ে প্রথম দু’দিনেই অন্তত চারটি মৃত্যুর ঘটনা সামনে এসেছে, যদিও প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক দলগুলি একে অপরের দিকে আঙুল তুলছে।
সংঘর্ষের ঘটনাও কম নয়। জলপাইগুড়ির বারোপাটিয়ায় বিজেপি সমর্থকদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে পরাজিত তৃণমূল প্রার্থী কৃষ্ণ দাসের বিরুদ্ধে। বিজেপির দাবি, তলোয়ার ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা চালানো হয়, তাতে কয়েকজন গুরুতর আহত হন। পরে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী এলাকায় পৌঁছায়। যদিও কৃষ্ণ দাস পাল্টা দাবি করেছেন, বিজেপি সমর্থকরাই প্রথমে তাঁকে আক্রমণ করতে আসে।
কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী এলাকাতেও উত্তেজনা ছড়ায়। টালিগঞ্জ, কসবা, বারুইপুর, কামারহাটি, বরানগর ও বহরমপুরে তৃণমূলের পার্টি অফিসে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ উঠেছে। হাওড়ায় এক প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলরকে মারধরের ঘটনাও সামনে এসেছে। নৈহাটিতে এক বিজেপি কর্মীর বাড়িতে হামলায় তিনজন আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ।
তবে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, অন্তত দুটি মৃত্যুর সঙ্গে সরাসরি রাজনৈতিক যোগ নেই—একটি ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে, অন্যটি দুর্ঘটনাজনিত।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নির্বাচন কমিশন কড়া অবস্থান নিয়েছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার রাজ্যজুড়ে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন। কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে, ভোট-পরবর্তী সহিংসতায় ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি নেওয়া হবে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও তীব্র। তৃণমূল এই ঘটনাগুলিকে “মধ্যযুগীয় বর্বরতা” বলে উল্লেখ করে বিজেপি-ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিকল্পিত হামলার অভিযোগ তুলেছে। অন্যদিকে বিজেপি সেই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলছে, তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব থেকেই এই অশান্তির জন্ম।
রাজ্য বিজেপি সভাপতি সমিক ভট্টাচার্য বলেন, “বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলানো জরুরি। আমরা স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছি, কোনও ধরনের সহিংসতা বরদাস্ত করা হবে না। আইন ভাঙলে, সে আমাদের দলের হলেও ব্যবস্থা নিতে হবে।”
একই সুর শোনা যায় শুভেন্দু অধিকারী-র কথাতেও। তিনি বলেন, “আইন নিজের হাতে কেউ তুলে নেবেন না। দিকে দিকে তৃণমূলই অশান্তি ছড়াচ্ছে। এখনও বাংলায় মহাজঙ্গলরাজ রয়েছে।” তাঁর আরও দাবি, “২০২১ এবং ২০২৩-এর তুলনায় এ বার বড় কোনও অশান্তি হয়নি। অনেকদিন পর মানুষ নির্ভয়ে ভোট দিতে পেরেছেন।”
পাশাপাশি শিক্ষাঙ্গনেও উত্তেজনার অভিযোগ উঠেছে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়-সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয় প্রভাব বিস্তার নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বড় প্রশ্ন—পালাবদলের পরেও কেন সহিংসতা থামছে না? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, স্থানীয় স্তরের দ্বন্দ্ব এবং ক্ষমতা পরিবর্তনের চাপ মিলেই এই অস্থিরতা তৈরি করেছে।
রাজ্যে নতুন সরকার গঠনের আগে তাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন একটাই—শান্তি ফেরানো। পালাবদলের প্রকৃত অর্থ তখনই স্পষ্ট হবে, যখন রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাও নিশ্চিত করা যাবে।





