বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই সাংগঠনিক স্তরে বড় সিদ্ধান্ত নিল সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস। দলের সমস্ত কমিটি ও শাখা সংগঠন ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা করা হয়েছে। মূল দল থেকে শুরু করে যুব, ছাত্র এবং মহিলা সংগঠনের বিদ্যমান কাঠামো আপাতত আর কার্যকর থাকবে না। কাজের মূল্যায়নের ভিত্তিতে নতুন করে সংগঠন সাজানোর কথা জানিয়েছে দল।
বুধবার দলের তরফে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত এক বার্তায় জানানো হয়, সর্বস্তরে আত্মসমালোচনা ও সাংগঠনিক পর্যালোচনার প্রক্রিয়া শুরু হবে। সেই মূল্যায়নের পর নতুন সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলা হবে। দলের দাবি, ভবিষ্যতের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করতেই এই পদক্ষেপ।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এটি শুধুমাত্র সাংগঠনিক রদবদল নয়, বরং ‘নতুন তৃণমূল’ তৈরির সূচনা। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর থেকেই দলের অন্দরে অসন্তোষ ও বিদ্রোহের সুর শোনা যাচ্ছিল। সেই সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বলতে শোনা গিয়েছিল, “যাঁরা যাওয়ার তাঁরা চলে যান। আমি নতুন করে তৃণমূলকে তৈরি করব।” সেই মন্তব্যের পর দীর্ঘদিন কোনও বড় সাংগঠনিক পদক্ষেপ দেখা না গেলেও, এবার একসঙ্গে সব কমিটি ভেঙে দিয়ে স্পষ্ট বার্তা দিল দল।
এই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগেই বিধানসভায় নতুন সমীকরণ তৈরি হয়। তৃণমূলের ৫৮ জন বিদ্রোহী বিধায়কের পক্ষ থেকে স্পিকারের কাছে একটি চিঠি জমা পড়ে। সেই চিঠিতে তাঁরা নিজেদেরই ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি করেন। চিঠি জমা দেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহারা।
তবে বিদ্রোহী শিবিরের অবস্থানেও রয়েছে একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক। বিধানসভায় প্রবেশের সময় তাঁরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই দলের নেত্রী বলে উল্লেখ করেন। স্পিকারের কাছে জমা দেওয়া নথিতেও তাঁর নেতৃত্বের প্রতি আস্থার কথা বলা হয়েছে। ফলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই সংঘাত সরাসরি মমতার বিরুদ্ধে নয়। বরং দলের অভ্যন্তরে নেতৃত্বের দ্বিতীয় স্তর নিয়ে অসন্তোষই সামনে এসেছে।
বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা ও মুখ্য সচেতক পদ নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে। আগে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের তরফে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা এবং ফিরহাদ হাকিমকে মুখ্য সচেতক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে বিদ্রোহী বিধায়করা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা এবং আখরুজ্জামানকে মুখ্য সচেতক করার প্রস্তাব জমা দিয়েছেন।
রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই এদিন নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ডাকা প্রশাসনিক বৈঠকে হাজির হন তৃণমূলের দুই শিবিরেরই একাধিক নেতা ও বিধায়ক। সেখানে যেমন ছিলেন ফিরহাদ হাকিম, নয়না বন্দ্যোপাধ্যায় ও কুণাল ঘোষ, তেমনই উপস্থিত ছিলেন জাভেদ খান, অশোক দেব, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সন্দীপন সাহারাও।
সব মিলিয়ে তৃণমূলের অন্দরে ক্ষমতার সমীকরণ নতুন মোড় নিচ্ছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। বিদ্রোহ, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং নেতৃত্বের প্রশ্ন— এই তিনের সংঘাতে আগামী দিনে রাজ্যের অন্যতম বড় রাজনৈতিক লড়াই কোন দিকে গড়ায়, সেদিকেই নজর থাকবে।





