ইনস্টাগ্রামে তাদের ফলোয়ার এখন প্রায় এক কোটির কাছাকাছি। সংখ্যাটা এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে দেশের বহু প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলকেও পিছনে ফেলেছে তারা। অথচ দলটির বয়স মাত্র কয়েক দিন। নামও শুনলে প্রথমে হাসি পেতে পারে— ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি। কিন্তু মজার মোড়কে শুরু হওয়া এই ডিজিটাল আন্দোলন এখন ভারতের তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভ, হতাশা এবং রাজনৈতিক অনাস্থার এক নতুন প্রতীক হয়ে উঠছে।
ঘটনার সূত্রপাত সুপ্রিম কোর্টের এক শুনানিতে। এক আইনজীবীর ‘সিনিয়র অ্যাডভোকেট’ মর্যাদা সংক্রান্ত মামলার শুনানির সময় দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত কিছু মন্তব্য করেন। সেই মন্তব্যের একটি অংশকে ঘিরেই বিতর্ক তৈরি হয়। সমাজমাধ্যমে দাবি করা হতে থাকে, বেকার তরুণদের ‘আরশোলা’র সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। যদিও পরে প্রধান বিচারপতি স্পষ্ট করে জানান, তাঁর বক্তব্য ভুল ভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তিনি বলেন, বেকার যুবকদের অপমান করার উদ্দেশ্যে তিনি কিছু বলেননি, বরং ভুয়ো ডিগ্রি নিয়ে পেশায় ঢোকা কিছু মানুষের প্রসঙ্গেই মন্তব্য করেছিলেন।
কিন্তু ততক্ষণে ডিজিটাল দুনিয়ায় আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। মিম, ব্যঙ্গ, প্রতিবাদ— সব মিলিয়ে তৈরি হতে শুরু করে এক অদ্ভুত রাজনৈতিক স্রোত। সেই স্রোতকেই সংগঠিত আকার দেন অভিজিৎ দীপকে নামে এক তরুণ। জন্ম হয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র।
দলের পরিচয়ই ব্যঙ্গাত্মক। নিজেদের তারা ঘোষণা করেছে “ধর্মনিরপেক্ষ, সমাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক এবং অলস” দল হিসেবে। সদস্য হওয়ার যোগ্যতার তালিকাও কম চমকপ্রদ নয়। বেকার হতে হবে, অনলাইনে সক্রিয় থাকতে হবে, আর পেশাগত জীবনের প্রতি কিছুটা ক্ষোভ থাকলে তবেই মিলবে সদস্যপদ।
শুরুতে বিষয়টিকে অনেকেই নিছক ইন্টারনেট ট্রেন্ড ভেবেছিলেন। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই হাজার হাজার যুবক-যুবতী নাম লেখাতে শুরু করেন। এখন সেই সংখ্যা লক্ষ ছাড়িয়েছে। ইনস্টাগ্রামে সিজেপির অনুসারীর সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। দেশের একাধিক পরিচিত মুখ, এমনকি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদেরও ওই অ্যাকাউন্ট ফলো করতে দেখা গিয়েছে।
তবে শুধু মিম বা ট্রোলিংয়ের মধ্যেই আটকে নেই সিজেপি। তাদের প্রকাশিত ‘ইস্তাহার’-এ রয়েছে একাধিক রাজনৈতিক দাবি। অবসর নেওয়ার পর প্রধান বিচারপতিদের রাজ্যসভায় পাঠানোর বিরোধিতা, সংসদে মহিলাদের জন্য ৫০ শতাংশ সংরক্ষণ, দলবদল করা জনপ্রতিনিধিদের দীর্ঘমেয়াদি নির্বাচনী নিষেধাজ্ঞা— এমন নানা বিষয় সেখানে তুলে ধরা হয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রেও দাবি তুলেছে তারা। সিবিএসই-র পুনর্মূল্যায়ন ফি বাতিল থেকে শুরু করে নিট-ইউজি প্রশ্নফাঁস ইস্যুতে ক্ষতিগ্রস্ত পড়ুয়াদের পাশে দাঁড়ানোর কথাও বলেছে দলটি।
এই ডিজিটাল আন্দোলনের মুখ অভিজিৎ দীপকে। পুণেতে সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনার পর তিনি আমেরিকায় উচ্চশিক্ষার জন্য যান। বর্তমানে বস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে জনসংযোগ বিষয়ে স্নাতকোত্তর করছেন। রাজনৈতিক যোগাযোগ কৌশল নিয়েই তাঁর কাজ। অতীতে আম আদমি পার্টির সমাজমাধ্যম টিমের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। ২০২০ সালের দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে আপের মিম-ভিত্তিক ডিজিটাল প্রচারে কাজ করেছিলেন অভিজিৎ।
বর্তমানে আমেরিকায় বসেই সিজেপির কার্যকলাপ পরিচালনা করছেন তিনি। সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অভিজিৎ বলেন, “আমি এক সপ্তাহ আগেও চাকরির জন্য আবেদন করছিলাম। তারপর আচমকা এই সব শুরু হয়ে গেল। হ্যাঁ, আমিই সেই আরশোলা, যার কথা বলা হচ্ছিল।”
তাঁর কথায়, এই বিপুল সাড়া কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়। বরং দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা হতাশার বিস্ফোরণ। অভিজিৎ বলেন, “সবচেয়ে বেশি যে অভিযোগটা শুনছি, সেটা হল— কেউ বেকারদের কথা শোনে না। তাঁদের অস্তিত্বকেও স্বীকার করা হয় না। এখন তাঁদের আরশোলা বা পরজীবীর সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। ফলে ক্ষোভ আরও বেড়েছে।”
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা বা নেপালের মতো দেশে তরুণ প্রজন্মের আন্দোলন নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে। ভারতে সেই ধরনের কোনও ‘জেন জ়ি আন্দোলন’ আদৌ তৈরি হতে পারে কি না, তা নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা চলছিল। সিজেপিকে ঘিরে তৈরি হওয়া উন্মাদনা সেই প্রশ্নকেই নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।
তবে এখনও স্পষ্ট নয়, ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ শেষ পর্যন্ত বাস্তব রাজনৈতিক দল হয়ে উঠবে, না কি এটি শুধুই ডিজিটাল প্রতিবাদের ভাষা হয়ে থাকবে। কিন্তু একটা বিষয় স্পষ্ট— ভারতের এক বড় অংশের তরুণ সমাজ নিজেদের উপেক্ষিত বলে মনে করছে। আর সেই ক্ষোভই এখন মিম, ব্যঙ্গ আর ভাইরাল পোস্টের ভাষায় রাজনীতির দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে।





