রাজ্যের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘিরে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে তৃণমূল কংগ্রেস এবং কংগ্রেসের সম্পর্ক। রাজনৈতিক মহলে জোর জল্পনা, ভবিষ্যতের সমীকরণ মাথায় রেখে দুই দলের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ছে। এমনও আলোচনা শুরু হয়েছে যে, তৃণমূলের ভবিষ্যৎ এবং কংগ্রেসের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতা বা বৃহত্তর রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস নিয়ে কথাবার্তা এগোতে পারে।
এই জল্পনার মধ্যেই সামনে এসেছে বঙ্গ কংগ্রেসের ভিতরের মতপার্থক্য। দলের একাংশ মনে করছে, তৃণমূল নেতৃত্বকে গ্রহণ করা হলে দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যে তৃণমূলের বিরুদ্ধে যে রাজনৈতিক লড়াই চালানো হয়েছে, তার নৈতিক ভিত্তিই প্রশ্নের মুখে পড়বে। তাঁদের বক্তব্য, রাজ্যের বহু কংগ্রেস কর্মী ও সমর্থক অতীতে তৃণমূলের সঙ্গে সরাসরি রাজনৈতিক সংঘর্ষের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন। ফলে সেই নেতৃত্বকেই ভবিষ্যতে নিজেদের নেতৃত্ব হিসেবে মেনে নেওয়া সহজ হবে না।
এই অবস্থানেই অনড় প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি তথা বর্ষীয়ান নেতা আবদুল মান্নান। তিনি বলেন, “আমার কংগ্রেস নেতৃত্বের উপর আস্থা রয়েছে। নো অ্যালায়েন্স উইথ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।”

একই সুর শোনা গিয়েছে কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরীর গলাতেও। তাঁর বক্তব্য, “যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একসময় কংগ্রেস ভাঙিয়েছিলেন, তাঁকেই এবার গান্ধী পরিবারের কাছে গিয়ে হাতেপায়ে ধরতে হচ্ছে। পাপের ফল ভোগ করতে হবেই।”
তবে প্রদেশ কংগ্রেসের বর্তমান সভাপতি শুভঙ্কর সরকারের অবস্থান তুলনামূলকভাবে ভিন্ন। তিনি সরাসরি কোনও ব্যক্তির নাম না করলেও দলে যোগদানের ক্ষেত্রে শর্তের কথা স্পষ্ট করে দিয়েছেন। শুভঙ্কর বলেন, “রাহুল গান্ধীকে ভাবি প্রধানমন্ত্রী মেনে নিয়ে যাঁরাই কংগ্রেসে আসবেন তাঁদের প্রত্যেককে স্বাগত।”
তবে দুর্নীতির অভিযোগে ঘেরা কোনও নেতাকে দলে নেওয়ার প্রশ্নে তাঁর অবস্থান কঠোর। শুভঙ্করের কথায়, “কারও গায়ে যদি দুর্নীতির দাগ লেগে থাকে, কেউ যদি নিজেকে বাঁচাতে কংগ্রেসের ছাতার তলায় আসতে চান, তাহলে তাঁর জন্য দরজা খোলা হবে না।”
জল্পনার অন্যতম কারণ, গত কয়েক দিনে দিল্লিতে কংগ্রেস এবং তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের ধারাবাহিক বৈঠক। প্রথমে সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ বৈঠক হয়। তার পরদিন রাহুল গান্ধীর সঙ্গে বৈঠক করেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই বৈঠকগুলিতে বাংলার বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, তৃণমূলের সাংগঠনিক ভবিষ্যৎ, সম্ভাব্য ভাঙন এবং বিরোধী রাজনীতির আগামী রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হয়ে থাকতে পারে।
যদিও দুই দলের তরফে বৈঠকের বিস্তারিত বিষয়বস্তু প্রকাশ্যে আনা হয়নি, তবু রাজধানীর রাজনৈতিক মহলে নানা ব্যাখ্যা ঘুরছে। কেউ কেউ মনে করছেন, বিরোধী রাজনীতির বৃহত্তর স্বার্থে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হতে পারে। আবার অন্য একটি অংশের দাবি, তৃণমূল নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—তৃণমূল এবং কংগ্রেসের সম্ভাব্য নৈকট্যের প্রশ্নে বঙ্গ কংগ্রেসের অন্দরে মতৈক্য নেই। দলের একাংশ যেখানে দরজা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে চাইছে, অন্য অংশ সেখানে শর্তসাপেক্ষে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছে না। ফলে আগামী দিনে দিল্লির সিদ্ধান্ত এবং বঙ্গ কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়া—দুইয়ের উপরই নজর থাকবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের।






