ফলতা বিধানসভার পুনর্নির্বাচনের ঠিক দু’দিন আগে আচমকাই ভোটের লড়াই থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা করলেন তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খান। মঙ্গলবার প্রচারের শেষ দিনে সাংবাদিক বৈঠক করে তিনি জানান, “আমি এই ভোটে লড়ছি না।” আর সেই ঘোষণার পর থেকেই দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর চর্চা।
জাহাঙ্গিরের সিদ্ধান্ত কি একান্তই ব্যক্তিগত, নাকি এর পিছনে রয়েছে তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের কোনও কৌশল— তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে রাজনৈতিক মহলে। কারণ, মনোনয়ন প্রত্যাহারের সময়সীমা অনেক আগেই পেরিয়ে গিয়েছে। ফলে ভোটে না লড়ার কথা ঘোষণা করলেও ইভিএমে তাঁর নাম থাকবেই।
নিজের সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে জাহাঙ্গির বলেন, “ফলতার উন্নয়নের জন্য মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। আমি চাই ফলতা শান্তিতে থাকুক, উন্নয়ন হোক। তাই আমি নিজেকে এই লড়াই থেকে সরিয়ে নিচ্ছি।” সাংবাদিক বৈঠকে কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণও হয়ে পড়েন তিনি। বলেন, “আমার স্বপ্ন ছিল সোনার ফলতা।”
তবে তাঁর এই ঘোষণার পরই রাজনৈতিক কটাক্ষ শুরু হয়েছে। যে নেতা কয়েক মাস আগেও নিজেকে ‘পুষ্পা’ বলে পরিচয় দিয়ে বলেছিলেন, “ঝুঁকেগা নহি”, সেই তিনিই শেষ মুহূর্তে ভোটের ময়দান ছাড়ায় বিরোধীরা আক্রমণ শানাতে শুরু করেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় কেউ লিখছেন, “গরমে পুষ্প পতন”, আবার কেউ কটাক্ষ করছেন, “পুষ্পা তো ঝুঁক গয়া।”
ফলতার রাজনীতিতে জাহাঙ্গির খানের উত্থান গত কয়েক বছরে ছিল চোখে পড়ার মতো। ডায়মন্ড হারবারের রাজনৈতিক বলয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন তিনি। পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি থাকাকালীন ওয়াই ক্যাটেগরির নিরাপত্তাও পেয়েছিলেন। যদিও পরে সেই নিরাপত্তা প্রত্যাহার করা হয়।
বিতর্কও কম ছিল না তাঁকে ঘিরে। ২০২২ সালের পুরভোটে বজবজ পুরসভার একটি ওয়ার্ডে দল অনুমোদন না দেওয়া প্রার্থীর হয়ে প্রচারে নামেন তিনি। সেই সময় থেকেই দলের ভিতরে তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
এবারের বিধানসভা নির্বাচনে ফলতা কেন্দ্রের প্রার্থী করা হয়েছিল জাহাঙ্গিরকেই। কিন্তু ভোটের আগেই তিনি খবরের শিরোনামে উঠে আসেন অন্য কারণে। ডায়মন্ড হারবার পুলিশ জেলার পর্যবেক্ষক আইপিএস অজয়পাল শর্মার সঙ্গে তাঁর প্রকাশ্য বাকযুদ্ধ রাজ্য রাজনীতিতে আলাদা মাত্রা তৈরি করেছিল। উত্তরপ্রদেশ ক্যাডারের এই পুলিশ অফিসারকে অনেকেই ‘সিংহম’ বলে উল্লেখ করতেন। সেই প্রসঙ্গ টেনেই জাহাঙ্গির বলেছিলেন, “উনি সিংহম হলে আমিও পুষ্পা… ঝুঁকেগা নহি।”
তারপর থেকেই ‘সিংহম বনাম পুষ্পা’ লড়াই রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। দ্বিতীয় দফার ভোটের দিন ফলতায় ইভিএম কারচুপির অভিযোগ ওঠে। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছয় যে, শেষ পর্যন্ত গোটা ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের ভোট বাতিল করে পুনর্নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেয় নির্বাচন কমিশন। আগামী ২১ মে আবার ভোটগ্রহণ হবে ২৮৫টি বুথে। গণনা ২৪ মে।
এদিকে ভোটের পর এলাকায় অশান্তির অভিযোগও ওঠে। বিজেপি কর্মীদের উপর হামলার ঘটনায় জাহাঙ্গিরের নাম টেনে অভিযোগ করতে থাকে গেরুয়া শিবির। এর মধ্যেই বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশে রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। বিজেপি সরকার গঠন করে এবং মুখ্যমন্ত্রী হন শুভেন্দু অধিকারী।
সরকার বদলের পর থেকেই জাহাঙ্গিরকে আর সক্রিয় প্রচারে দেখা যাচ্ছিল না। যদিও কয়েক দিন আগে দলীয় কার্যালয়ে এসে তিনি দাবি করেছিলেন, তিনি মাথা নোয়াবেন না। কিন্তু সেই অবস্থান থেকে সরে এসে মঙ্গলবার ভোটের ময়দান ছাড়ার ঘোষণায় নতুন জল্পনা শুরু হয়েছে।
তার আগে ফলতার সভা থেকে জাহাঙ্গিরকে সরাসরি নিশানা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেছিলেন, “ভোট শেষ হোক। ওর ব্যবস্থা করব। সেই দায়িত্ব আমার।” পাশাপাশি মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্ট টেনে জাহাঙ্গিরকে “নটোরিয়াস ক্রিমিনাল” বলেও কটাক্ষ করেন মুখ্যমন্ত্রী।
এই আবহেই সোমবার কলকাতা হাই কোর্টে গিয়ে গ্রেফতারি এড়াতে রক্ষাকবচ নিয়েছিলেন জাহাঙ্গির। আর তার পরের দিনই ভোটে না লড়ার ঘোষণা। ফলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের প্রশ্ন, চাপ বাড়ছিল বলেই কি শেষ পর্যন্ত সরে দাঁড়ালেন ‘পুষ্পা’?
এক সময় যিনি বলেছিলেন “ঝুঁকেগা নহি”, পুনর্নির্বাচনের আগেই সেই জাহাঙ্গির খানের রাজনৈতিক অবস্থান যে বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে, তা এখন স্পষ্ট।





