মধ্যমগ্রামের দোহাড়িয়া এখনও থমথমে। বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)-র আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথ খুনের ঘটনায় তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে পরিকল্পিত হত্যার ইঙ্গিত। পুলিশ সূত্রে খবর, বুধবার রাতের হামলার আগে প্রায় ছ’ঘণ্টা ধরে এলাকায় রেকি চালানো হয়েছিল। খুনের ঘটনায় ব্যবহৃত গাড়ি ও বাইকে ছিল ভুয়ো নম্বরপ্লেট। এমনকি গাড়ির শ্যাসি নম্বরও ঘষে মুছে দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি তদন্তকারীদের।
বুধবার রাতে আবাসনের কাছে চন্দ্রনাথকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। ঘটনাস্থলেই পড়ে যায় তাঁর দেহ। গুরুতর জখম হন গাড়িচালক বুদ্ধদেব বেরাও। বর্তমানে বাইপাসের ধারের একটি হাসপাতালে আইসিইউ-তে চিকিৎসাধীন তিনি। বৃহস্পতিবার অস্ত্রোপচার করে তাঁর শরীর থেকে গুলি বার করা হয়েছে।
তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পেরেছে, হামলাকারীরা অন্তত দু’টি বাইক এবং একটি চারচাকার গাড়ি ব্যবহার করেছিল। ঘটনাস্থল থেকে গাড়িটি উদ্ধার হলেও অভিযুক্তেরা এখনও অধরা। পরে আরও একটি বাইক উদ্ধার হয়, যা ঘটনাস্থল থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে ফেলে যাওয়া হয়েছিল। সেই বাইকের নথিভুক্ত মালিকের খোঁজ করতে গিয়ে নতুন ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। আসানসোলের বার্নপুরের যে ঠিকানার উল্লেখ রয়েছে, সেখানে ওই নামে কেউ থাকেন না বলেই জানতে পেরেছে পুলিশ।
তদন্তকারীদের অনুমান, চন্দ্রনাথের গতিবিধি সম্পর্কে অত্যন্ত নির্ভুল তথ্য ছিল দুষ্কৃতীদের কাছে। কারণ, তাঁর বাড়ি ফেরা বা বেরোনোর নির্দিষ্ট সময় ছিল না। তা সত্ত্বেও নির্দিষ্ট সময়েই হামলা চালানো হয়েছে। ফলে ভিতর থেকে তথ্য পাচারের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মোবাইল ফোনের সূত্র ধরেও এগোচ্ছে তদন্ত। কোন টাওয়ার থেকে কার ফোন গিয়েছিল, সেই তথ্যে নজর রাখা হচ্ছে। তদন্তকারীদের ভাষায়, ‘কল ডাম্প’ বা ‘টাওয়ার ডাম্প’-এর মাধ্যমে সন্দেহভাজনদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। এলাকার একাধিক সিসিটিভি ফুটেজও সংগ্রহ করেছে পুলিশ। একটি ফুটেজে দেখা গিয়েছে, চন্দ্রনাথের গাড়ির পিছনে কিছু দূরত্ব বজায় রেখে বাইকে দু’জন যুবক যাচ্ছেন।
এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিট গঠন করা হয়েছে। রাজ্য পুলিশের পাশাপাশি এসটিএফ এবং সিআইডি-র আধিকারিকেরাও রয়েছেন সেই দলে। এলাকায় মোতায়েন রয়েছে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী।
ঘটনার পর থেকেই রাজনৈতিক চাপানউতোরও তীব্র হয়েছে। শুভেন্দু দাবি করেছেন, “একটি নিষ্পাপ, শিক্ষিত, তরুণকে খুন করা হল কেবলমাত্র বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীর আপ্তসহায়ক বলে।” তাঁর আরও অভিযোগ, “ঠান্ডা মাথায় রেকি করে খুন করা হয়েছে।” দ্রুত অভিযুক্তদের গ্রেফতার করে কঠোর শাস্তির দাবিও জানিয়েছেন তিনি।
বিজেপির তরফে এই হত্যাকাণ্ডে তৃণমূলের বিরুদ্ধে পরোক্ষ অভিযোগ তোলা হয়েছে। দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য (Samik Bhattacharya) একে ‘রাজনৈতিক হত্যা’ বলে দাবি করেছেন। যদিও পুলিশ এখনও পর্যন্ত কোনও রাজনৈতিক যোগের কথা আনুষ্ঠানিক ভাবে জানায়নি।
সবচেয়ে আবেগঘন ছবি ধরা পড়েছে চন্দ্রনাথের বাড়িতে। ছেলের মৃত্যুতে ভেঙে পড়া মা হাসিরানি রথ অবশ্য খুনিদের ফাঁসি চান না। তাঁর কথায়, “দোষীরা শাস্তি পাক। আমি মা, তাই চাইব না ফাঁসি হোক। আমি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড চাইছি।”
চন্দ্রনাথের দেহ বৃহস্পতিবার পূর্ব মেদিনীপুরের চণ্ডীপুরে তাঁর গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হলে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ভিড় জমায় বহু মানুষ। জাতীয় পতাকায় মোড়া দেহের সামনে তখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—কারা, কেন এত ঠান্ডা মাথায় এই হত্যার ছক কষল?





