ভোট মিটতেই শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের গণনাকেন্দ্রে ইভিএম নিয়ে কারসাজির অভিযোগ ঘিরে উত্তেজনা চরমে ওঠে বৃহস্পতিবার রাতে। শাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল-এ অবস্থিত গণনাকেন্দ্রে পৌঁছে যান তৃণমূল প্রার্থী নিজে, প্রায় চার ঘণ্টা সেখানে অবস্থানও করেন। একইসঙ্গে ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্র-এর গণনাকেন্দ্রেও অনিয়মের অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ দেখানো হয়।
এই ঘটনার পরেই প্রশ্ন উঠছে—ভোটের পর থেকে গণনার আগ পর্যন্ত ইভিএম কীভাবে রাখা হয়? আদৌ কি সেখানে কারসাজির সুযোগ থাকে?
ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরই ইভিএমের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ—ব্যালট ইউনিট, কন্ট্রোল ইউনিট এবং ভিভিপ্যাট—বন্ধ করে দেওয়া হয়। তার পর প্রার্থীদের এজেন্টদের উপস্থিতিতে একাধিক স্তরে সিল করা হয়। সিলের যথার্থতা যাচাই করে দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক ও এজেন্টরা সই করেন। ফলে পরবর্তীতে সেই সিল ভাঙার চেষ্টা হলে তা সহজেই চোখে পড়ার কথা।
এর পর কড়া নিরাপত্তার মধ্যে ইভিএমগুলি স্ট্রংরুমে পাঠানো হয়। এই পরিবহণ প্রক্রিয়াও নজরবন্দি থাকে—জিপিএস ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হয়। চাইলে প্রার্থী বা তাঁদের প্রতিনিধিরা এই সময় সঙ্গে থাকতে পারেন।
স্ট্রংরুমে পৌঁছনোর পর নিরাপত্তা আরও কঠোর হয়। ডবল তালা, কেন্দ্রীয় বাহিনীর পাহারা এবং সার্বক্ষণিক সিসিটিভি নজরদারিতে রাখা হয় ইভিএম। শুধু কমিশন নয়, রাজনৈতিক দলগুলিও এই নজরদারির অংশ হতে পারে—প্রার্থীরা তাঁদের প্রতিনিধিদের স্ট্রংরুমের বাইরে রাখতে পারেন এবং সিসিটিভি ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।
স্ট্রংরুমে প্রবেশের নিয়মও অত্যন্ত কড়াকড়িভাবে নিয়ন্ত্রিত। কোনও কারণে ইভিএম সরানো বা স্পর্শ করার প্রয়োজন হলে তা নির্দিষ্ট লগবুকে নথিভুক্ত করতে হয় এবং নির্দিষ্ট আধিকারিক ও পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক।
গণনার দিনেও প্রক্রিয়াটি বহুস্তরীয় যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে যায়। প্রার্থী ও তাঁদের এজেন্টদের সামনে প্রথমে সিল পরীক্ষা করা হয়। সিল অক্ষত থাকলে তবেই তা খোলা হয় এবং শুরু হয় ভোটগণনা। কন্ট্রোল ইউনিটে সংরক্ষিত ভোটের তথ্যের সঙ্গে ভিভিপ্যাট স্লিপ মিলিয়ে দেখা হয়, যাতে ফলাফলের নির্ভুলতা নিশ্চিত করা যায়।
এই গোটা ব্যবস্থার বৈধতা একাধিকবার বিচারব্যবস্থার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। Supreme Court of India-ও ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে মত জানিয়েছে, পাশাপাশি ভিভিপ্যাট মিলিয়ে দেখার মাধ্যমে স্বচ্ছতা আরও বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে।
এবারের নির্বাচনে নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে Election Commission of India। গণনাকেন্দ্রে প্রবেশের জন্য চালু হয়েছে কিউআর কোড-ভিত্তিক পরিচয়পত্র। তিন স্তরের যাচাই প্রক্রিয়া পেরিয়েই প্রবেশ করতে হবে গণনাকেন্দ্রে, যা নিরাপত্তার মাত্রা আরও বাড়াবে বলে মনে করছে কমিশন।
সব মিলিয়ে, ইভিএম নিয়ে বিতর্ক যতই তীব্র হোক, নির্বাচন কমিশনের দাবি—পুরো প্রক্রিয়াই বহুস্তরীয় নিরাপত্তা ও নজরদারির মধ্যে পরিচালিত হয়। ফলে কারসাজির সম্ভাবনা কার্যত নেই বলেই তাদের অবস্থান। তবে রাজনৈতিক তরজায় এই ইস্যু যে আরও কিছুদিন শিরোনামে থাকবে, তা বলাই যায়।





