ভোটের কালি আঙুলে দিলে কেন ওঠে না? নির্বাচনে এর ব্যবহার শুরু কীভাবে? 

On: Thursday, March 19, 2026 12:28 PM
---Advertisement---

ভোট দিয়ে বেরোনোর পর বাঁ হাতের তর্জনীতে লেগে থাকা কালির দাগ—এ যেন শুধু একটি চিহ্ন নয়, গণতান্ত্রিক অধিকারের দৃশ্যমান স্বাক্ষর। অনেকের কাছেই এটি গর্বের প্রতীক, বিশেষ করে নতুন ভোটারদের মধ্যে। কিন্তু এই ‘ভোটের কালি’ কেন এত স্থায়ী, কীভাবে এর ব্যবহার শুরু—তার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস ও বিজ্ঞানভিত্তিক এক গোপন সূত্র।

ভারতে প্রথম ভোটের কালি ব্যবহার শুরু হয় ১৯৬২ সালে, তৃতীয় লোকসভা নির্বাচনের সময়। মূল উদ্দেশ্য ছিল একটাই—ভোটে কারচুপি রোধ করা। যাতে কোনও ভোটার একাধিকবার ভোট দিতে না পারেন, সেই জন্যই তর্জনীতে লাগানো হয় বিশেষ ধরনের এই কালি। সময়ের সঙ্গে কালি লাগানোর পদ্ধতিতে পরিবর্তন এলেও কালির মূল বৈশিষ্ট্য অপরিবর্তিত রয়েছে।

এই কালির প্রকৃত নাম ‘ইনডেলিবল ইঙ্ক’—অর্থাৎ এমন কালি, যা সহজে মুছে ফেলা যায় না। নির্বাচন কমিশন এই কালি খোলাবাজার থেকে কেনে না, বরং নির্দিষ্ট বরাত দিয়ে তৈরি করায়। সেই দায়িত্ব বহু বছর ধরে পালন করে আসছে মাইসুরুর সংস্থা ‘মাইসোর পেন্টস অ্যান্ড ভার্নিশ লিমিটেড’ বা এমপিভিএল।

এই সংস্থার ইতিহাসও কম পুরনো নয়। ১৯৩৭ সালে মাইসুরুর রাজপরিবারের উদ্যোগে ‘মাইসোর ল্যাক ফ্যাক্টরি’ নামে এর যাত্রা শুরু। স্বাধীনতার পরে কর্নাটক সরকার সেটি অধিগ্রহণ করে। শুরুতে গালা তৈরির জন্য পরিচিত হলেও বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের জন্য ভোটের কালি তৈরিই তাদের অন্যতম প্রধান কাজ। শুধু ভারত নয়, বিশ্বের বহু দেশেই এই সংস্থার তৈরি কালি ব্যবহার করা হয় নির্বাচনে।

তবে এই কালির আসল রহস্য লুকিয়ে রয়েছে তার উপাদানে। ১৯৬২ সালে ‘ন্যাশনাল ফিজ়িক্যাল ল্যাবরেটরি’ এই কালির ফর্মুলা তৈরি করেছিল। সেই সূত্র এখনও গোপন রাখা হয়েছে। জানা যায়, সংস্থার মাত্র দু’জন কর্মী এই ফর্মুলার অংশবিশেষ জানেন, এবং প্রজন্মান্তরে তা হস্তান্তরিত হয় নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে।

যদিও পুরো ফর্মুলা প্রকাশ্যে নয়, বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই কালির মূল উপাদান ‘সিলভার নাইট্রেট’। এর সঙ্গে মেশানো থাকে কিছু রাসায়নিক এবং রং, আর দ্রুত শুকিয়ে যাওয়ার জন্য অ্যালকোহল। ‘সিলভার নাইট্রেট’-ই এই কালির স্থায়িত্বের মূল চাবিকাঠি। ত্বকের প্রোটিনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে এটি আঙুলে স্থায়ী দাগ তৈরি করে। সূর্যালোকের অতিবেগনি রশ্মির সংস্পর্শে এসে সেই দাগ আরও গাঢ় হয়ে ওঠে।

এই কারণেই ভোটের কালি সহজে মুছে ফেলা যায় না। তবে এর মাত্রা এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়, যাতে ত্বকের কোনও ক্ষতি না হয়। ভারতে ব্যবহৃত এই কালি সাধারণত ২ থেকে ৩ সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী থাকে।একসময় শুধু নখের গোড়ায় ছোট করে লাগানো হলেও এখন নিয়ম বদলেছে। নখের উপরিভাগ থেকে তর্জনীর প্রথম গাঁটের আগে পর্যন্ত লম্বা দাগ টানা হয়, যাতে তা আরও স্পষ্ট ও দীর্ঘস্থায়ী হয়।

গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই ছোট্ট কালির দাগ তাই কেবল পরিচয়ের চিহ্ন নয়, বরং বিশ্বাসযোগ্যতা ও স্বচ্ছতার প্রতীক। ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে আঙুলে সেই দাগ লাগানোর মুহূর্তেই নাগরিকের অধিকার আর দায়িত্ব—দুটোই একসঙ্গে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now