পশ্চিমবঙ্গে এবারের বিধানসভা নির্বাচনে দুই দফা ঘিরে যে ছবি উঠে এল, তা সাম্প্রতিক ইতিহাসে বিরল বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচনী হিংসার অভিযোগে বিতর্কিত এই রাজ্যে এবার ভোট প্রক্রিয়া তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ থেকেছে, আর সেই সঙ্গে নজির গড়েছে ভোটদানের হারও।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দুই দফা মিলিয়ে মোট ভোট পড়েছে ৯২.৫৬ শতাংশ। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার (Gyanesh Kumar) জানিয়েছেন, “স্বাধীনতার পর থেকে পশ্চিমবঙ্গে প্রথম ও দ্বিতীয় দফা, দুই পর্যায়েই সর্বোচ্চ ভোটদানের হার।” তাঁর এই দাবি ইঙ্গিত করছে, ভোটারদের অংশগ্রহণে এবার নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে।
এই উচ্চ ভোটদানের পেছনে কমিশনের প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভোটের আগে থেকেই রাজ্যে মোতায়েন করা হয় কেন্দ্রীয় বাহিনী, যাতে সাধারণ মানুষ নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেন। কমিশনের দাবি, সেই কৌশল কার্যকর হয়েছে বলেই এবার বহু ‘নির্বাক’ ভোটারও বুথমুখী হয়েছেন।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, দুই দফার ভোটে কোনও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। অতীতের সঙ্গে তুলনা করলে এই পরিবর্তন স্পষ্ট। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে যেখানে ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল, সেখানে ২০১৬ সালে সেই সংখ্যা ছিল ৭। এবার সেই সংখ্যা নেমে এসেছে শূন্যে—যা প্রশাসনিক সাফল্য হিসেবেই দেখছে কমিশন।
হিংসা কমার আরও একটি সূচক মিলেছে বিস্ফোরক উদ্ধারের পরিসংখ্যানে। ২০২১ সালে যেখানে ৬৯টি বোমা উদ্ধার হয়েছিল, এবার এখনও পর্যন্ত একটিও বোমা উদ্ধারের খবর নেই। একই সঙ্গে বিরোধী দলের পোলিং এজেন্টদের বুথ থেকে বের করে দেওয়ার মতো অভিযোগও কার্যত অনুপস্থিত।
তবে অভিযোগ একেবারেই নেই, এমন নয়। মোট ৭৭টি বুথ থেকে নানা অনিয়মের অভিযোগ এসেছে—যার মধ্যে ব্যালট টেম্পারিং থেকে শুরু করে অন্যান্য কারিগরি সমস্যার কথাও রয়েছে। এই অভিযোগগুলির ভিত্তিতে ফলতা, মগরাহাট, ডায়মন্ড হারবার ও বজবজের মোট ৭৭টি বুথে পুনর্নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন ঘিরে সম্ভাব্য অশান্তি রুখতে আগাম পদক্ষেপও নিয়েছিল কমিশন। মোট ৬৮৭ জনকে প্রিভেন্টিভ গ্রেফতার করা হয়েছিল, যাঁদের বিরুদ্ধে নির্বাচনী গোলযোগে জড়ানোর আশঙ্কা ছিল।
সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচন এক নতুন বার্তা দিচ্ছে—বাংলায় উচ্চ ভোটদান আর শান্তিপূর্ণ নির্বাচন একসঙ্গে সম্ভব। যদিও বাকি দফাগুলির দিকে এখন নজর, তবে প্রথম দুই দফার অভিজ্ঞতা অন্তত আশাবাদী করে তুলছে প্রশাসন থেকে সাধারণ ভোটার—সকলকেই।





