২০২৪-এর রাজনৈতিক মানচিত্রে বাংলা এখন বিজেপির অন্যতম প্রধান দুর্গ। ২০১৪ সালে কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদি সরকার গঠনের পর থেকে রাজ্যে গেরুয়া শিবিরের যে বাড়বাড়ন্ত লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তার শিকড় কিন্তু আজ বা কালকের নয়। বরং এই মহীরুহের বীজ রোপণ করা হয়েছিল সাত দশক আগে, খোদ কলকাতার মাটি থেকেই।
জনসংঘের আদি পর্ব ও মেদিনীপুরের লড়াই
আজকের বিজেপি যে শক্তিশালী কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তার কারিগর ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। ১৯৫১ সালে জনসংঘ প্রতিষ্ঠা করে তিনি মন্ত্র দিয়েছিলেন, “দেশের জন্য বাঁচতে হবে, দেশের জন্য মরতে হবে।” তাঁর লড়াই ছিল বাংলাকে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গড়ে তোলার। ১৯৫২ সালের নির্বাচনে কলকাতা দক্ষিণ-পূর্ব আসন থেকে তিনি নিজেই ছিলেন জনসংঘের প্রথম সাংসদ।
মজার বিষয় হলো, বর্তমানে শুভেন্দু অধিকারীর ‘গড়’ হিসেবে পরিচিত মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রাম এলাকায় জনসংঘের আধিপত্য ছিল সেই পঞ্চাশের দশকেই। রামকৃষ্ণ মিশনের সঙ্গে যুক্ত দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় সে সময় আদিবাসী অধ্যুষিত ঝাড়গ্রাম থেকে সাংসদ হয়ে চমক দিয়েছিলেন। অর্থাৎ, হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির উর্বর জমি তৈরির কাজটা বহু আগেই শুরু হয়েছিল।
বাম জমানা ও স্তব্ধ হওয়া সম্ভাবনা
দেশভাগের যন্ত্রণা সওয়া পশ্চিমবঙ্গ আরএসএস বা জনসংঘের জন্য আদর্শ ক্ষেত্র হতে পারত। কিন্তু দীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম শাসন এবং তাদের ‘লিবেরাল ধর্মনিরপেক্ষ’ সংস্কৃতির প্রভাবে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির গতিপথ বারবার বাধা পেয়েছে। হরিপদ ভারতী, তপন শিকদার বা বিজয় কুমার মণ্ডলদের মতো নেতারা শত প্রতিকূলতার মাঝেও সংগঠনের প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছিলেন। বিশেষ করে হরিপদ ভারতী ছিলেন বিজেপি প্রতিষ্ঠার পর বাংলার প্রথম সভাপতি এবং তপন শিকদার দমদম থেকে দুবার সাংসদ হয়ে দলের উপস্থিতি জানান দিয়েছিলেন।
আরএসএসের নীরব কর্মযজ্ঞ
পদ্ম ফোটাতে আরএসএস দীর্ঘকাল ধরে জঙ্গলমহল ও উত্তরবঙ্গের রাজবংশী এলাকায় কাজ করে গিয়েছে। ছোট ছোট স্কুল ও ব্রতচারী কেন্দ্রের মাধ্যমে তৃণমূল স্তরে হিন্দুত্বের প্রচার চালিয়েছে তারা। সংঘ জানত, শুধু আদর্শ দিয়ে হবে না, দরকার শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠন। সেই শূন্যস্থান পূরণ করতেই ২০১৪ সালের পর বঙ্গ বিজেপিতে বড় পরিবর্তন আসে।
দিলীপ ঘোষ ও সাংগঠনিক বিপ্লব
রাহুল সিনহা যখন এক হাতে সংগঠন সামলাচ্ছিলেন, ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে দলের হাল ধরেন আরএসএস প্রচারক দিলীপ ঘোষ। আন্দামানে সাংগঠনিক সাফল্য পাওয়ার পর তাঁকে বাংলায় পাঠানো হয়। তাঁর আমলেই বিজেপি শূন্য থেকে ৭৭টি বিধানসভা আসন এবং ১৮টি লোকসভা আসন জয়ের স্বাদ পায়। তাঁর রাখা মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই পরবর্তীতে সুকান্ত মজুমদাররা সংগঠনকে এগিয়ে নিয়ে যান।
আধুনিক রূপকার ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
আজকের বিজেপির এই চেহারার পেছনে দুজনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। প্রথমজন শমীক ভট্টাচার্য, যাঁর মার্জিত ও পরিশীলিত ব্যক্তিত্ব মধ্যবিত্ত বাঙালির ড্রয়িংরুমে বিজেপির গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে। দ্বিতীয়জন শুভেন্দু অধিকারী, যাঁর চনমনে প্রচার ও হিন্দুত্বের জোয়ার রাজ্য রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
শুরুটা করেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ, আর তাকে পূর্ণতা দিলেন আজকের প্রজন্মের নেতারা। সাত দশকের এই দীর্ঘ যাত্রাপথে তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতার দেওয়াল ভেঙে আজ বঙ্গ বিজেপি এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে।





