সাল ২০২৬। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে আবারও বদলের পালা। ২০১১ সালে যে ‘পরিবর্তন’-এর ঢেউয়ে ভেসে ক্ষমতায় এসেছিল তৃণমূল কংগ্রেস, দেড় দশক পর সেই দলই এবার ক্ষমতা হারাল। রাজ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রে উঠে এল নতুন সমীকরণ—প্রথমবারের জন্য ক্ষমতার কেন্দ্রে বিজেপি। কিন্তু এই ফলাফল হঠাৎ নয়, বরং দীর্ঘদিনের জমে থাকা অসন্তোষ, কৌশলগত ব্যর্থতা এবং সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্মিলিত ফল।
প্রথমেই উঠে আসে প্রতিষ্ঠান-বিরোধী মনোভাব। দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার ফলে স্বাভাবিকভাবেই শাসকের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি হয়। কিন্তু তৃণমূলের ক্ষেত্রে এই ক্ষোভ ছিল আরও তীব্র। নিচুতলার নেতৃত্বের বিরুদ্ধে দাদাগিরি, সিন্ডিকেট রাজ, কাটমানি এবং তোলাবাজির অভিযোগ সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়িয়েছে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ, যা শাসকদলের ভাবমূর্তিতে বড় আঘাত করেছে।
এই নির্বাচনে ধর্মীয় মেরুকরণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। গত কয়েক বছরে রাজ্যে হিন্দুত্বের রাজনীতি ক্রমশ শক্তিশালী হয়েছে। বিভিন্ন আন্দোলন, উৎসব ঘিরে উত্তেজনা এবং রাজনৈতিক বার্তা—সব মিলিয়ে বিজেপি এই আবহকে সংগঠিত ভোটে পরিণত করতে পেরেছে। পাল্টা হিসেবে তৃণমূলও ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহার করতে চেয়েছে, কিন্তু বিজেপির তৈরি ‘হিন্দু-বিরোধী’ ইমেজ থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। অন্যদিকে, সংখ্যালঘু ভোটও আর এককভাবে তৃণমূলের দিকে যায়নি—বিভিন্ন ছোট দল ও জোট সেই ভোটব্যাঙ্কে ভাগ বসিয়েছে।
নির্বাচনের আগে ‘এসআইআর’ বা ভোটার তালিকা সংশোধন ঘিরে বিতর্কও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে ওঠে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারবার নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিলেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত এই ইস্যুতে অতিরিক্ত জোর দেওয়ার ফলে সরকারের উন্নয়নমূলক কাজ বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বার্তা আড়ালে পড়ে যায়। উপরন্তু, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার অভিযোগও শাসকদলের বিরুদ্ধেই জনমত তৈরি করে।
অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের প্রশ্নে চাপ ছিল আরও বেশি। নিয়োগ দুর্নীতি, বেকারত্ব, শিল্পের অভাব—এই সমস্ত ইস্যু দীর্ঘদিন ধরে জমে ছিল। সরকারি চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তা, ডিএ ও বেতন কাঠামো নিয়ে অসন্তোষ, সব মিলিয়ে মধ্যবিত্ত ও যুবসমাজের একাংশ তৃণমূলের থেকে মুখ ফিরিয়েছে। একসময় মহিলাদের মধ্যে জনপ্রিয়তা তৈরি করেছিল বিভিন্ন ভাতা প্রকল্প, কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় সেই সমর্থনেও ফাটল দেখা যায়। বিজেপি পাল্টা আর্থিক প্রতিশ্রুতি দিয়ে সেই জায়গায় প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছে।
এবারের ভোটে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ‘বাঙালি অস্মিতা’র প্রশ্ন। ২০২১ সালে এই ইস্যু তৃণমূলকে বড় সুবিধা দিয়েছিল। কিন্তু পাঁচ বছরে বিজেপি নিজেদের কৌশল বদলেছে। স্থানীয় নেতৃত্বকে সামনে আনা, বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করার চেষ্টা—এসবের ফলে ‘বহিরাগত’ তকমা অনেকটাই মুছে গেছে। ফলে একই ইস্যুতে বারবার ভরসা করে তৃণমূল প্রত্যাশিত সাড়া পায়নি।
সবশেষে, সংগঠনগত দুর্বলতাও স্পষ্ট হয়েছে। নিচুতলার ভাঙন, তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে সংযোগের অভাব এবং বিজেপির শক্তিশালী নির্বাচনী যন্ত্রের সামনে তৃণমূল পিছিয়ে পড়ে। পাশাপাশি ‘ডবল ইঞ্জিন সরকার’-এর প্রতিশ্রুতি—অর্থাৎ কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের সরকার থাকলে উন্নয়ন দ্রুত হবে—এই ধারণাও ভোটারদের একাংশকে প্রভাবিত করেছে।
সব মিলিয়ে, এই ফলাফল কেবল একটি নির্বাচনী হার নয়; এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তনের ইঙ্গিত। তৃণমূলের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—এই বার্তাকে কতটা দ্রুত বুঝে নিজেদের পুনর্গঠন করতে পারে। আর বিজেপির সামনে প্রশ্ন—ক্ষমতায় এসে সেই প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পারে।





