পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের আবহে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইডি-র ধারাবাহিক তল্লাশি ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক দানা বেঁধেছে। নির্বাচন ঘোষণার দিন থেকে শুরু করে মাত্র ৪৪ দিনের মধ্যে রাজ্যে মোট ৬৮ বার তল্লাশি চালিয়েছে ইডি। কোন কোন মামলায়, কোথায় কোথায় এই অভিযান হয়েছে—তা নিয়ে যেমন কৌতূহল তৈরি হয়েছে, তেমনই উঠছে সময় নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন।
ভোট ঘোষণার আগেই রাজ্যে ইডি-র তৎপরতা শুরু হয়। জানুয়ারিতে আই-প্যাক সংক্রান্ত মামলায় সংস্থার কর্তা প্রতীক জৈনের বাড়ি ও অফিসে তল্লাশি চালানো হয়, যা নিয়ে আইনি লড়াই গড়ায় সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। ফেব্রুয়ারিতে সহারা গোষ্ঠী সংক্রান্ত তদন্তে অন্ধ্রপ্রদেশ, কর্নাটক ও ওড়িশায় অভিযান চালায় ইডি। একই সময়ে কয়লা পাচার মামলায় দুর্গাপুর ও আসানসোলেও তল্লাশি হয়।
ভোট ঘোষণার পর ১৬ মার্চ থেকেই রাজ্যে একের পর এক অভিযানে নামে সংস্থাটি। সাইবার প্রতারণা মামলায় কলকাতা, হাওড়া, শিলিগুড়ি ও দুর্গাপুরে ১৬টি জায়গায় তল্লাশি চালিয়ে প্রায় আড়াই কোটি টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। পাশাপাশি হোটেল, জমি ও রিসর্ট মিলিয়ে প্রায় ২০ কোটি টাকার স্থাবর সম্পত্তির হদিস মেলে। শিলিগুড়ি থেকে উদ্ধার হয় বাংলাদেশি পাসপোর্ট, দামি গাড়ি ও বিদেশি মদের বোতল।
২৮ মার্চ জমি দখল ও প্রতারণা মামলায় কলকাতার সাতটি জায়গায় তল্লাশি চালায় ইডি। ব্যবসায়ী অমিত গঙ্গোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে একাধিক এফআইআরের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হয়। এই মামলায় তৃণমূল প্রার্থী দেবাশিস কুমারকেও তলব করা হয়।
এপ্রিলের শুরুতেই আলোচনায় আসে ‘সোনা পাপ্পু’ মামলা। ১এপ্রিল দক্ষিণ কলকাতার ব্যবসায়ী বিশ্বজিৎ পোদ্দার ওরফে সোনা পাপ্পুর বাড়ি-সহ আটটি জায়গায় তল্লাশি চালিয়ে নগদ ১.৪৭ কোটি টাকা, প্রায় ৬৭ লক্ষ টাকার গয়না, অস্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ নথি উদ্ধার করে ইডি। তোলাবাজি, জমি দখল ও বেআইনি নির্মাণের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের অভিযোগে তদন্ত এগোতে থাকে। ১৯ এপ্রিল এই মামলায় ফের তল্লাশি চালিয়ে ব্যবসায়ী জয় কামদারকে গ্রেফতার করা হয়। হাওয়ালার মাধ্যমে বিদেশে অর্থ লেনদেন এবং পুলিশকর্তাদের সঙ্গে যোগসূত্রের অভিযোগ উঠে আসে তদন্তে। ২৬ এপ্রিল আবার এই মামলায় তল্লাশি চালিয়ে নগদ ও নথি উদ্ধার হয়।
রেশন দুর্নীতি মামলাতেও একাধিক জায়গায় অভিযান চালায় ইডি। ১০ এপ্রিল কলকাতা, বনগাঁ, মুর্শিদাবাদ, রানিগঞ্জ ও হাবড়া মিলিয়ে ১৭টি স্থানে তল্লাশি চালিয়ে ৩০ লক্ষ টাকার বেশি নগদ উদ্ধার হয়। ২৫ এপ্রিল আরও ১১টি জায়গায় অভিযান চালিয়ে মোট উদ্ধার প্রায় ৪৯ লক্ষে পৌঁছয়। অভিযোগ, রেশনের গম ভুয়ো নথির মাধ্যমে বাংলাদেশে পাচার করা হচ্ছিল।
এ ছাড়াও, নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতে গিয়ে বয়ান নেন তদন্তকারীরা। পুর নিয়োগ মামলায় তৃণমূল নেতা সুজিত বসু ও রথীন ঘোষকে তলব করা হয়। ফ্ল্যাট প্রতারণা মামলায় তলব করা হয় তৃণমূলের প্রাক্তন সাংসদ নুসরত জাহানকেও।
নির্বাচনের মাঝেই এই ধারাবাহিক তল্লাশি ঘিরে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস সরব হয়েছে। তাদের অভিযোগ, ভোটের সময় কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলিকে ব্যবহার করে বিরোধীদের চাপে রাখার চেষ্টা করছে কেন্দ্র। একাধিক সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই নিয়ে সরব হয়েছেন। অন্যদিকে, ইডির বক্তব্য—তদন্ত চলমান মামলার ভিত্তিতেই হচ্ছে, এর সঙ্গে নির্বাচনের সময়ের কোনও যোগ নেই।
ফলে প্রশ্ন উঠছে, ভোটের আবহে ইডির এই তৎপরতা কি নিছকই তদন্তের অগ্রগতি, না কি এর পেছনে রয়েছে বৃহত্তর রাজনৈতিক তাৎপর্য? ৪৪ দিনে ৬৮টি তল্লাশি সেই প্রশ্নকেই আরও তীব্র করে তুলেছে।





