নামের মধ্যে নিরীহ ভাব থাকলেও বাস্তবে তার প্রভাব ভয়াবহ। El Niño—এই জলবায়ুগত ঘটনাই আবার শিরোনামে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের একাংশের আশঙ্কা, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই এর তীব্রতা বেড়ে ‘সুপার’ রূপ নিতে পারে। আর সেই সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার চিত্র আমূল বদলে দিতে পারে।
বিভিন্ন পরিবেশ ও আবহাওয়া সংক্রান্ত বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ২০২৬ থেকে ২০২৭-এর মধ্যে স্বাভাবিক এল নিনোর তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী পর্যায় দেখা যেতে পারে। বিজ্ঞানীদের মতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ার প্রবণতাই এই আশঙ্কাকে জোরালো করছে। যদি এই ধারা বজায় থাকে, তা হলে তা এক সময় ‘সুপার এল নিনো’-য় পরিণত হতে পারে।
এল নিনো মূলত প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্বাংশে—বিশেষ করে চিলি ও পেরু উপকূলবর্তী অঞ্চলে—উষ্ণ স্রোতের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি দিয়ে চিহ্নিত হয়। সাধারণত দুই থেকে সাত বছর অন্তর এই প্রক্রিয়া সক্রিয় হয়। এই সময় সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ২ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে শুধু সমুদ্র নয়, সংলগ্ন স্থলভাগের বায়ুমণ্ডলেও তাপমাত্রা বেড়ে যায়।
স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম প্রান্ত অপেক্ষাকৃত বেশি উষ্ণ থাকে। কিন্তু এল নিনোর সময় সেই ভারসাম্য ভেঙে যায়। উষ্ণ জল পূর্বদিকে সরে গিয়ে পূর্ব উপকূলের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে সমুদ্রতলের ঠান্ডা জলের উপরে ওঠার প্রক্রিয়াও ব্যাহত হয়, ফলে গরম আরও জমাট বাঁধে।
এই পরিবর্তনের প্রভাব কোনও নির্দিষ্ট অঞ্চলে আটকে থাকে না। দক্ষিণ এশিয়ায় তীব্র তাপপ্রবাহ ও বর্ষায় ঘাটতি দেখা দেয়। অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় খরা ও দাবানলের ঝুঁকি বাড়ে। আবার দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অঞ্চলে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত ও বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। উত্তর আমেরিকার দক্ষিণাংশে অতিবৃষ্টি হলেও উত্তরাংশে শীত তুলনায় উষ্ণ হয়।
ইতিহাস বলছে, এই প্রাকৃতিক ঘটনাকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। ১৮৭৭ সালের ভয়াবহ এল নিনোর সময় বিশ্বের বহু অঞ্চলে খরা, ফসলহানি ও দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত হয়েছিল জনজীবন। সেই সময়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলে অনুমান। আজকের জনসংখ্যার নিরিখে একই মাত্রার বিপর্যয় হলে তার প্রভাব বহুগুণ বাড়তে পারে বলেই আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে উদ্বেগ আরও বাড়াচ্ছে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন। Climate Change-এর প্রভাবে সমুদ্রের তাপমাত্রা আগেই বেড়ে রয়েছে। তার সঙ্গে এল নিনো যুক্ত হলে তাপপ্রবাহ আরও চরম আকার নিতে পারে। বিজ্ঞানীদের কথায়, “যা একসময় বিরল ছিল, এখন তা ঘন ঘন ঘটছে এবং আরও তীব্র হয়ে উঠছে।”
ভারতের ক্ষেত্রেও এই প্রভাব তাৎপর্যপূর্ণ। বর্ষার উপর নির্ভরশীল কৃষি ও অর্থনীতি এল নিনোর সময় বড় ধাক্কা খেতে পারে। অতীতে দেখা গিয়েছে, একাধিক বছরে এল নিনোর প্রভাবে বর্ষায় বৃষ্টিপাত কম হয়েছে। ২০০৯, ২০১৫-র মতো বছর তার উদাহরণ। ফলে ফসল উৎপাদন কমে যাওয়া, মূল্যবৃদ্ধি এবং জলসংকট—সবই একসঙ্গে সামনে এসেছে।
ইতিমধ্যেই চলতি বছরেই তার আভাস মিলছে। ভারতের একাধিক অঞ্চলে তাপমাত্রা অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। এপ্রিলেই ৪৩-৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁয়ে ফেলেছে বহু জায়গা। আবহাওয়া দফতরের মতে, প্রশান্ত মহাসাগরের এই পরিবর্তনের প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ায় বারবার ফিরে আসে।
সব মিলিয়ে, ‘ছোট্ট ছেলে’ নামের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই শক্তিশালী প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া আবারও বিশ্বকে বড় পরীক্ষার সামনে দাঁড় করাতে পারে। এখন নজর একটাই—আশঙ্কা কতটা বাস্তবে রূপ নেয় এবং তার মোকাবিলায় কতটা প্রস্তুত থাকতে পারে বিশ্ব।





