কালো কোট পরে কলকাতা হাইকোর্টে হাজির হয়ে ভোট-পরবর্তী হিংসার অভিযোগে সরব হলেন পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। আদালতের এজলাসে দাঁড়িয়ে তিনি দাবি করলেন, পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে নিজের বাড়ি থেকে বেরিয়ে থানায় অভিযোগ জানাতেও বাধা পাচ্ছেন তিনি। সেই সওয়ালের মাঝেই এক আইনজীবীর “এখানে নাটক করবেন না” মন্তব্য ঘিরে তৈরি হয় উত্তেজনা।
বৃহস্পতিবার কলকাতা হাইকোর্টে ভোট-পরবর্তী হিংসা সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে আইনজীবীর ভূমিকায় হাজির হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মামলাটি দায়ের করেছেন শ্রীরামপুরের তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় (Kalyan Banerjee)-র ছেলে এবং উত্তরপাড়ার পরাজিত তৃণমূল প্রার্থী শীর্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল (Sujoy Paul)-এর বেঞ্চে তৃণমূলের হয়ে সওয়াল করেন মমতা।
এজলাসে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, “আমাকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পুলিশের কাছে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। অনলাইনে অভিযোগ জানাতে হচ্ছে। কিন্তু তাতে কিছু হচ্ছে না।” তাঁর অভিযোগ, রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের উপর আক্রমণ চলছে। সংখ্যালঘু ও তফসিলি সম্প্রদায়ের মানুষকে ভয় দেখানো হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
মমতা আদালতে বলেন, “মাছ-মাংসের দোকান বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। বৃদ্ধকে বাড়ি থেকে বার করে দেওয়া হচ্ছে। তফসিলি জাতি, সংখ্যালঘুদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এটা বুলডোজার রাজ্য নয়। বাংলার মানুষকে বাঁচান।”
এই সময় আদালতের ভিতর থেকেই এক আইনজীবী মন্তব্য করেন, “এখানে নাটক করবেন না।” সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা জবাব দেন মমতা। তাঁর কথায়, “আমি ১৯৮৫ সাল থেকে আইনজীবী। সেই হিসেবেই সওয়াল করতে চাই।”
শুনানিতে তৃণমূলের তরফে আরও বিস্ফোরক দাবি তোলা হয়। কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আদালতে জানান, ভোট-পরবর্তী হিংসায় এখনও পর্যন্ত ১০ জন নিহত হয়েছেন। প্রায় ১৫০ থেকে ১৬০টি তৃণমূল পার্টি অফিসে আগুন লাগানো বা ভাঙচুরের অভিযোগও তোলা হয়। আদালতের হস্তক্ষেপ ছাড়া রাজ্যে শান্তি ফেরানো সম্ভব নয় বলেই দাবি তাঁদের।
মমতা আরও জানান, রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় দুই হাজারেরও বেশি অশান্তির ঘটনা ঘটেছে বলে তাঁদের কাছে অভিযোগ এসেছে। বহু তৃণমূল কর্মী ঘরছাড়া। এমনকি এক ১২ বছরের কিশোরীকেও ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে আদালতে দাবি করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, এসবের পরেও পুলিশ কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
যদিও রাজ্য পুলিশের তরফে এই অভিযোগের বিরোধিতা করা হয়। পুলিশের আইনজীবী Dhiraj Trivedi আদালতে বলেন, “এই মামলাটি পুরানো ভোট পরবর্তী সন্ত্রাসের মামলার সঙ্গে যুক্ত করে বৃহত্তর বেঞ্চে পাঠিয়ে দেওয়া হোক।” তাঁর বক্তব্য, কোথায় কোথায় অশান্তি হয়েছে, তার স্পষ্ট তালিকা আদালতে দেওয়া হয়নি। “২০০০টি ঘটনার কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু বিস্তারিত তথ্য নেই। কারা আক্রান্ত, কারা অভিযুক্ত, তাও পরিষ্কার নয়,” বলেন তিনি।
পুলিশের দাবি, প্রতিটি অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নিউটাউনে বুলডোজার চালানোর ঘটনাতেও সরকারের কোনও ভূমিকা নেই বলে আদালতে জানানো হয়। ওই ঘটনায় ইতিমধ্যেই ন’জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলেও দাবি পুলিশের।
তিনজলায় অবৈধ নির্মাণ ভাঙার ঘটনাকে আদৌ ভোট-পরবর্তী হিংসার আওতায় ফেলা যায় কি না, সেই প্রশ্নও তোলে রাজ্যের পক্ষ। আদালতে জানানো হয়েছে, সমস্ত অভিযোগ খতিয়ে দেখে হলফনামা জমা দেওয়া হবে।
রাজ্যের রাজনৈতিক পালাবদলের পর আদালতের এজলাসে এই সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়াল বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।





