১৫ লাখে বিকোচ্ছে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন, নিট প্রশ্নফাঁস বাণিজ্যের ব্লু-প্রিন্ট ফাঁস

On: Tuesday, May 12, 2026 11:12 PM
---Advertisement---

সর্বভারতীয় ডাক্তারি প্রবেশিকা নিট-ইউজি ২০২৬-এর প্রশ্নফাঁস নিয়ে তোলপাড় গোটা দেশ। তদন্তভার সিবিআই-এর হাতে যাওয়ার পর থেকেই একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসছে। তবে এই প্রশ্নফাঁস কি নেহাতই কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা? তদন্তকারী এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সূত্র বলছে, এর নেপথ্যে রয়েছে কয়েকশো কোটি টাকার এক সুসংগঠিত ‘প্রশ্ন-বাণিজ্য’। যা অত্যন্ত পেশাদার উপায়ে ধাপে ধাপে ছড়িয়ে দেওয়া হয় দেশজুড়ে।

**পিরামিড মডেলে প্রশ্ন বিক্রি**

তদন্তকারীরা দেখছেন, এই চক্রের কার্যপ্রণালী অনেকটা পিরামিডের মতো। এর মাথায় বসে থাকে ‘সলভার গ্যাং’-এর মাস্টারমাইন্ডরা। ছাপাখানা বা প্রশ্নপত্র সরবরাহের রুটে এদের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ থাকে। কিন্তু এই মাথারা সরাসরি কোনো পরীক্ষার্থীর কাছে যান না। প্রথম ধাপেই ৫ থেকে ১০ কোটি টাকার বিনিময়ে প্রশ্নপত্রটি তুলে দেওয়া হয় আঞ্চলিক ‘কিংপিন’ বা বড় দালালদের হাতে। এরপরই শুরু হয় লাভের খেলা।

কোটা, সিকারে বা পটনার মতো কোচিং হাবে ঘাঁটি গেড়ে থাকা এই দালালেরা একেকজন পরীক্ষার্থীর থেকে ১৫ থেকে ৩০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত দাবি করেন। মাত্র ১০ জন সচ্ছল ছাত্র জোগাড় করতে পারলেই দালালের লাভ দাঁড়ায় ৫০০ শতাংশ। পরীক্ষার কয়েক ঘণ্টা আগে আসে ‘খুচরো বাজার’। তখন টেলিগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে মাত্র ২৫ থেকে ৫০ হাজার টাকায় বিলি হতে থাকে প্রশ্নের সেট। এই গোটা শৃঙ্খলে প্রায় ১০০ কোটি টাকার লেনদেন হয় বলে অনুমান করা হচ্ছে।

**মেধাবী পড়ুয়াই যখন ‘সলভার’**

আশ্চর্যজনকভাবে, এই অপরাধের শৃঙ্খলে জড়িয়ে পড়ছে খোদ পড়ুয়াই। পিরামিডের তৃতীয় স্তরে থাকে ‘সলভার’রা। দ্রুত নির্ভুল উত্তরপত্র তৈরি করে দেওয়ার জন্য কোনো মেধাবী পড়ুয়া বা ডাক্তারি ছাত্রকে ২ থেকে ৫ লক্ষ টাকা পারিশ্রমিক দেওয়া হয়। তাদের তৈরি করা উত্তরপত্রই পৌঁছে যায় শেষ ধাপে থাকা ‘ডেলিভারি এজেন্ট’দের মাধ্যমে।

**নাসিক থেকে হরিয়ানা: দেশজুড়ে জাল**

তদন্তে উঠে আসছে, মহারাষ্ট্রের নাসিকে এক গোপন বৈঠকের মাধ্যমেই এই ষড়যন্ত্র দানা বেঁধেছিল। সেখান থেকে প্রশ্নপত্র যায় হরিয়ানায়, যেখানে তৈরি হয় পাঁচটি আলাদা সেট। এরপর রাজস্থানের জয়পুর ও সিকার হয়ে সেই প্রশ্ন ছড়িয়ে পড়ে অন্ধ্রপ্রদেশ, দিল্লি, বিহার ও জম্মু-কাশ্মীরে। রাজস্থান পুলিশ ইতিমধ্যেই ১৫ জনকে আটক করেছে। গ্রেফতার করা হয়েছে মণীশ নামক এক ব্যক্তিকে, যাকে এই চক্রের অন্যতম পাণ্ডা বলে মনে করা হচ্ছে।

**উত্তাল রাজনীতি ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ**

পরীক্ষা বাতিল হওয়ায় কেন্দ্রকে কড়া ভাষায় বিঁধতে শুরু করেছে বিরোধী পক্ষ। রাহুল গান্ধী সমাজমাধ্যমে তোপ দেগে লিখেছেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রীর তথাকথিত ‘অমৃত কাল’ দেশের জন্য ‘বিষ কাল’-এ পরিণত হয়েছে।’’ তাঁর দাবি, বার বার প্রশ্নপত্র মাফিয়ারা পার পেয়ে গেলেও মানসিক ও আর্থিক চাপ সহ্য করতে হয় লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীকে।

অন্যদিকে, তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র মোদী জমানার পরিসংখ্যান টেনে তীব্র কটাক্ষ করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘‘প্রশ্নফাঁস বিতর্কের জেরে নিট-ইউজি ২০২৬ প্রবেশিকা বাতিল হয়ে গিয়েছে। মোদী জমানায় গত এক দশকে প্রায় ১০০ বার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে এবং ৫০ বার নতুন করে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। এ বারের ফাঁসের ঘটনায় ২০ লক্ষেরও বেশি পড়ুয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কেউ কি এর দায় নেবে?’’

আপাতত এনটিএ পরীক্ষা বাতিল করলেও ২০ লক্ষ ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ এখন সিবিআই তদন্ত আর নতুন পরীক্ষার দিনক্ষণের অপেক্ষায় ঝুলে আছে।

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now