ফলতার পুনর্নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্ন ঘুরছে, তা হল— মাত্র দু’বছরে এমন বদল কী ভাবে সম্ভব? যে কেন্দ্রে ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে Abhishek Banerjee-র নেতৃত্বে তৃণমূল বিপুল ব্যবধানে এগিয়ে ছিল, সেই ফলতাতেই এ বার বিজেপির প্রার্থী দেবাংশু পান্ডা জিতলেন এক লক্ষ ৯ হাজারেরও বেশি ভোটে। শুধু হার নয়, তৃণমূলের ভোটের এই পতন কার্যত রাজনৈতিক ভূমিকম্প বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহলের একাংশ।
ভোটের পরিসংখ্যান আরও তাৎপর্যপূর্ণ। এ বারের নির্বাচনে মোট প্রদত্ত ভোটের প্রায় ৭১ শতাংশ গিয়েছে বিজেপির ঝুলিতে। অন্য দিকে, ২০২৪ সালে প্রায় ৮৯ শতাংশ ভোট পাওয়া তৃণমূল নেমে এসেছে মাত্র ৪ শতাংশে। উল্লেখযোগ্য ভাবে, গত লোকসভা ভোটে কার্যত অস্তিত্বহীন থাকা Communist Party of India (Marxist) এ বার ১৯ শতাংশ ভোট পেয়েছে। সিপিএম ছাড়া বাকি সব বিরোধী দলের প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে।
ফলতা কেন্দ্র নিয়ে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় থেকেই বুথদখল, বিরোধীদের ভোট দিতে বাধা, প্রতীক ঢেকে দেওয়ার মতো অভিযোগ উঠেছিল। তবে সেই অভিযোগ চাপা পড়ে যায় তৃণমূলের বিশাল জয়ের ব্যবধানে। কিন্তু পুনর্নির্বাচনের পরে সেই জমে থাকা ক্ষোভই যেন বিস্ফোরিত হয়েছে বলে দাবি বিরোধীদের।
নির্বাচন কমিশন আগের ভোট বাতিল করে পুনর্নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কমিশনের বক্তব্য ছিল, অবাধ ও স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ। পুনর্নির্বাচনের পরে বিরোধী দলগুলির দাবি, এ বার সাধারণ মানুষ ভয় ছাড়াই ভোট দিতে পেরেছেন। ভোটের দিন বুথমুখী মানুষের ভিড় এবং ৮৮ শতাংশের বেশি ভোটদানের হার সেই দাবিকেই জোরদার করেছে বলে মত রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের।
ফল প্রকাশের পর মুখ্যমন্ত্রী Suvendu Adhikari সমাজমাধ্যমে সরাসরি আক্রমণ করেন Abhishek Banerjee-কে। তিনি লেখেন, “প্যারাশুটে নেমে সেনাপতি আখ্যা পাওয়া এক জালিয়াত, এমন কোনও অপরাধ নেই, যা সংগঠিত করেনি। নিজের অপরাধ সিন্ডিকেটকে প্রতিষ্ঠিত করতে গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করতেও কোনও কসুর করেনি এই বাঘের ছাল পরিহিত বেড়াল।”
Amit Malviya-ও তৃণমূলকে নিশানা করে দাবি করেন, “২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে কী ঘটেছিল, কেউ ভোলেননি। অজস্র ভোটযন্ত্রে বিজেপির প্রতীক ঢেকে দেওয়া হয়েছিল, যাতে কেউ বিজেপি-কে ভোট দেওয়ার সুযোগই না পান। আজ সেই ফলতা বিধানসভাই বাস্তবটা দেখিয়ে দিয়েছে।”
অন্য দিকে, Sujan Chakraborty-র বক্তব্য, “এই ভোটের ফলাফল প্রমাণ করছে, ভাইপোর ডায়মন্ড হারবার মডেল ছিল আসলে লুটের মডেল। এই ফলাফল প্রমাণ করছে তৃণমূল কখনওই বিজেপির বিকল্প ছিল না।”
ফলতার এই ফলাফল ঘিরে বারবার ফিরে আসছে অতীতের কেশপুর ও আরামবাগের প্রসঙ্গও। এক সময় Communist Party of India (Marxist)-এর তথাকথিত ‘দুর্ভেদ্য দুর্গ’ বলে পরিচিত ছিল সেই অঞ্চলগুলি। বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, সেখানে অবাধ ভোট হত না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই রাজনৈতিক শক্ত ঘাঁটিও ভেঙে পড়েছিল। এখন প্রশ্ন উঠছে, ফলতায় কি সেই একই পথেই হাঁটছে তৃণমূল?
যদিও তৃণমূলের দাবি আলাদা। দলের নেতা Shovandeb Chattopadhyay বলেন, “এই নির্বাচনে যে কোনও কারণেই হোক আমাদের প্রার্থী সরে দাঁড়িয়েছিলেন। তাই স্বাভাবিক কারণেই আমরা ভোট পাইনি। ওই দুটি বিষয়কে কখনওই এক করে দেখা উচিত হবে না বলে আমি মনে করি।”
তবে রাজনৈতিক মহলের বড় অংশের মতে, ফলতার ফল শুধুই একটি কেন্দ্রের হার-জিত নয়। এটি ডায়মন্ড হারবারের রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দিল।





