‘কোনও রকমে পাশ’, মাধ্যমিকের ফলেই সামনে এল শিক্ষাব্যবস্থার বেহাল দশা

On: Friday, May 8, 2026 7:52 PM
---Advertisement---

মাধ্যমিকের ফলপ্রকাশের দিন প্রতি বছরই কিছু মুখ আলাদা করে সামনে আসে। কেউ ৬৯০ পেরোয়, কেউ ৯৯ শতাংশের গণ্ডি ছুঁয়ে ফেলে। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ৬৯৮ নম্বর পেয়ে রাজ্যে প্রথম হয়েছে অভিরূপ ভদ্র। শতাংশের হিসেবে যা ৯৯.৭১। কিন্তু টপারদের সাফল্যের উজ্জ্বল আলোয় ঢাকা পড়ে যাচ্ছে আর এক বাস্তব ছবি। সেই ছবিতে দেখা যাচ্ছে, এ বছরের মাধ্যমিকে ৫০ শতাংশ নম্বরও পায়নি অর্ধেকের বেশি পরীক্ষার্থী।

মধ্যশিক্ষা পর্ষদের প্রকাশিত পরিসংখ্যান বলছে, এ বার ৯০ শতাংশের উপরে নম্বর পেয়েছে মাত্র ১.৪৬ শতাংশ পড়ুয়া। অন্য দিকে ৫৫ শতাংশ পরীক্ষার্থীর প্রাপ্ত নম্বর ৫০ শতাংশের নীচে। অর্থাৎ, সামগ্রিক ফলাফলে বড় অংশের পড়ুয়ার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে শিক্ষামহলে।

শুধু নম্বরের হিসাব নয়, বিষয়ভিত্তিক ফলও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে গণিত, ইংরেজি এবং ভৌতবিজ্ঞানে উচ্চ নম্বর পাওয়া পড়ুয়ার সংখ্যা কমেছে উল্লেখযোগ্য ভাবে। শিক্ষকদের একাংশের মতে, বিশ্লেষণধর্মী এবং ধারণাভিত্তিক পড়াশোনার জায়গায় এখন পরীক্ষামুখী প্রস্তুতি বাড়ছে। ফলে মুখস্থনির্ভর অংশে কোনও রকমে নম্বর এলেও যুক্তিভিত্তিক প্রশ্নে সমস্যায় পড়ছে পড়ুয়ারা।

এ বছর মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হয়েছে ৭ লক্ষ ৮২ হাজার ৯৭০ জন। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক পরীক্ষার্থী পেয়েছে ২৫ থেকে ৩৪ নম্বরের মধ্যে। পর্ষদের তথ্য অনুযায়ী, সি গ্রেডে উত্তীর্ণ হয়েছে ৩ লক্ষ ২৮ হাজার ৯৬৩ জন পড়ুয়া, যা মোট পরীক্ষার্থীর প্রায় ৩৪.৪৯ শতাংশ। বিপরীতে ৯০-এর উপরে নম্বর পাওয়া এএ গ্রেডের পড়ুয়ার সংখ্যা মাত্র ১৩ হাজার ৮৯৫।

খাতা মূল্যায়নের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষকদের একাংশের বক্তব্য, পরীক্ষার খাতায় দুর্বলতার চিত্র স্পষ্ট ছিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কলকাতার এক প্রধান পরীক্ষক বলেন, “আমাদের উপর মৌখিক নির্দেশ ছিল, পাশ নম্বরের কাছাকাছি থাকলে কিছু গ্রেস মার্কস দিয়ে পাশ করিয়ে দিতে হবে। কিন্তু এমন বহু খাতা এসেছে যেখানে নম্বর ৫-এর বেশি দেওয়া সম্ভব হয়নি।”

ওই শিক্ষকের দাবি, ইতিহাস ও ভূগোলের বড় প্রশ্নে অনেক পড়ুয়াই নিজের ভাষায় উত্তর লিখতে পারেনি। ইংরেজি ব্যাকরণেও একই দুর্বলতা ধরা পড়েছে। তবে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা গণিতে। অনেক পরীক্ষকই জানিয়েছেন, একাধিক খাতায় শূন্য দিতে হয়েছে।

শিক্ষামহলের একাংশ এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী করছেন দীর্ঘদিনের শিক্ষানীতি এবং স্কুলে অনিয়মিত উপস্থিতিকে। কলকাতার এক প্রধানশিক্ষকের কথায়, “প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাশ-ফেল তুলে দেওয়ার ফলে পড়ুয়ারা নিয়মিত পড়াশোনার অভ্যাস হারিয়েছে। এর প্রভাব পরে গিয়ে পড়ছে মাধ্যমিকের মতো পরীক্ষায়।”

আর এক শিক্ষক জানান, বহু পড়ুয়াই এখন স্কুলে নিয়মিত আসে না। বিশেষ করে সরকারি ও সরকারপোষিত স্কুলগুলিতে উপস্থিতির হার কমছে। তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে পঠনপাঠনে।

শিক্ষক নেতা স্বপন মণ্ডল বলেন, “তৃণমূল সরকারের আমলে শিক্ষাক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রকল্পকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। অনেক পড়ুয়া শুধুমাত্র সেই সুবিধা পাওয়ার জন্য স্কুলে নাম নথিভুক্ত করত, কিন্তু নিয়মিত ক্লাস করত না। তার ফল এখন সামনে আসছে। আগামী দিনে স্কুলে শৃঙ্খলা ফেরানো না গেলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।”

অন্য দিকে শিক্ষক নেতা অনিমেষ হালদার সমস্যার আর এক দিক তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য, “বহু বছর ধরে স্কুলগুলিতে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ হয়নি। ফলে পড়ুয়ারা ঠিক মতো গাইডেন্স পাচ্ছে না। পাশ-ফেল প্রথা তুলে দেওয়ার প্রভাবও রয়েছে।”

ফলাফলের এই পরিসংখ্যান তাই শুধু নম্বরের হিসাব নয়, বাংলার স্কুলশিক্ষার ভিত কতটা শক্ত, সেই প্রশ্নও তুলে দিচ্ছে নতুন করে। টপারদের সাফল্য নিঃসন্দেহে গর্বের। কিন্তু সেই ছবির বাইরে যে বিপুল সংখ্যক পড়ুয়া ন্যূনতম দক্ষতাও অর্জন করতে পারছে না, সেই বাস্তবতাই এখন বড় উদ্বেগ হয়ে উঠছে শিক্ষামহলে।

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now