বাংলার রাজনীতিতে বড় মোড়। ২০২৬ সালের এই মে মাসকে আলাদা করে মনে রাখা হবে। কারণ, এই প্রথম পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সরকার গঠিত হতে চলেছে, আর সেই সরকারের মুখ হতে চলেছেন শুভেন্দু অধিকারী। কাঁথির এক কাউন্সিলরের রাজনৈতিক যাত্রা শেষ পর্যন্ত পৌঁছল রাজ্যের প্রশাসনিক শীর্ষে।
শনিবার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন শুভেন্দু। শুধু একটি রাজনৈতিক পদ নয়, এই শপথের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রায় তিন দশকের রাজনৈতিক লড়াই, দলবদল, আন্দোলন, সংঘাত এবং ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার দীর্ঘ ইতিহাস।
১৯৭০ সালের ১৫ ডিসেম্বর পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথিতে জন্ম শুভেন্দুর। রাজনীতি তাঁর কাছে বাইরের কোনও জগৎ ছিল না। বাড়ির পরিবেশই ছিল রাজনৈতিক। বাবা শিশির অধিকারী দীর্ঘদিন সাংসদ এবং কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। পরিবারের অন্য সদস্যরাও সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ফলে খুব অল্প বয়স থেকেই সংগঠন, নির্বাচন এবং জনসংযোগের বাস্তব রাজনীতি কাছ থেকে দেখেছেন তিনি।
রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে নব্বইয়ের দশকে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ। শুরুটা কংগ্রেসের হাত ধরে। ১৯৯৫ সালে কাঁথি পুরসভার কাউন্সিলর নির্বাচনে জয় তাঁর রাজনৈতিক কেরিয়ারের প্রথম বড় সাফল্য। কিন্তু বাংলার রাজনীতির পালাবদলের সময় ঘনিয়ে আসছিল। ১৯৯৮ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নতুন দল তৃণমূল কংগ্রেস গঠনের পর বাবার সঙ্গে সেই দলেই যোগ দেন শুভেন্দু।
তার পরের কয়েক বছর তাঁকে মূলত সংগঠক হিসেবেই দেখা গিয়েছে। কিন্তু ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম আন্দোলন কার্যত তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় বদলে দেয়। জমি আন্দোলনের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন শুভেন্দু অধিকারী। ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি গ্রামীণ বাংলার বড় অংশে তাঁকে পরিচিত করে তোলে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করেন, নন্দীগ্রাম আন্দোলনই পরবর্তী সময়ে বামফ্রন্ট সরকারের পতনের ভিত তৈরি করেছিল, আর সেই আন্দোলনের অন্যতম স্থপতি ছিলেন শুভেন্দু।
২০০৬ সালে কাঁথি দক্ষিণ কেন্দ্র থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হওয়ার পরে তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব দ্রুত বাড়তে থাকে। ২০০৯ সালে তমলুক লোকসভা কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়ে প্রথম বার সংসদে যান। পাঁচ বছর পরে একই কেন্দ্র ধরে রেখে নিজের সাংগঠনিক শক্তির প্রমাণ দেন আবারও।
২০১৬ সালে নন্দীগ্রাম থেকে বিধায়ক হয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান। পরিবহণ দফতরের পাশাপাশি পরে সেচ ও জলসম্পদ দফতরের দায়িত্বও সামলেছেন। প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি জেলা স্তরে সংগঠনের উপর তাঁর নিয়ন্ত্রণও ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছিল।
কিন্তু তৃণমূলের সঙ্গে দূরত্ব বাড়তে শুরু করে ২০২০ সাল থেকে। দলীয় অন্দরে মতপার্থক্য, নেতৃত্বের প্রশ্ন এবং রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে জল্পনা তখন তুঙ্গে। শেষ পর্যন্ত ডিসেম্বর মাসে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন শুভেন্দু। অমিত শাহের উপস্থিতিতে গেরুয়া শিবিরে তাঁর প্রবেশ সেই সময় বাংলার রাজনীতিতে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হয়েছিল। কারণ, শুভেন্দুর দলবদলের পরই তৃণমূলের একাধিক নেতা বিজেপিমুখী হন।
২০২১ সালের নির্বাচন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়। নন্দীগ্রামে সরাসরি মুখোমুখি হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। সেই লড়াই শুধু একটি কেন্দ্রের নির্বাচন ছিল না, তা ছিল বাংলার রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতীকী যুদ্ধও। ফল প্রকাশের পরে মমতাকে হারিয়ে জাতীয় স্তরেও শিরোনামে উঠে আসেন শুভেন্দু। রাজনৈতিক মহল তাঁকে তখন ‘জায়ান্ট কিলার’ বলেই আখ্যা দেয়। পরে বিজেপির পরিষদীয় দলনেতা এবং বিরোধী দলনেতার দায়িত্ব পান তিনি।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন আরও এক ধাপ এগিয়ে দিল শুভেন্দুকে। শুধু নন্দীগ্রাম নয়, ভবানীপুর থেকেও জয়ী হন তিনি। ভবানীপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারানোকে রাজনৈতিক মহল এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় প্রতীকী মুহূর্ত হিসেবেই দেখছে। বিজেপির ২০৭ আসনে জয় কার্যত বাংলার রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিয়েছে।
শুক্রবার বিজেপির নবনির্বাচিত বিধায়কদের বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর নাম চূড়ান্ত হয়। অমিত শাহের উপস্থিতিতে সেই সিদ্ধান্ত ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায়, বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায় শুরু হতে চলেছে।
কাঁথির কাউন্সিলর থেকে বাংলার প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী— শুভেন্দু অধিকারীর এই রাজনৈতিক সফর এখন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, তা রাজ্যের রাজনৈতিক পালাবদলেরও প্রতীক।





