পশ্চিমবঙ্গের সপ্তদশ বিধানসভা আনুষ্ঠানিক ভাবে ভেঙে দেওয়ার বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে লোক ভবন। রাজ্যপাল টি এন রবি (T N Ravi)-র দফতরের তরফে জানানো হয়েছে, বৃহস্পতিবার থেকেই সেই নির্দেশ কার্যকর হয়েছে। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের পরই তৈরি হয়েছে এক জটিল সাংবিধানিক প্রশ্ন—নতুন সরকার শপথ নেওয়ার আগে রাজ্যের প্রশাসনিক দায়িত্ব এখন কার হাতে?
প্রশাসনিক মহলের একাংশের মতে, বিধানসভা ভেঙে যাওয়া মানে কার্যত বিদায়ী মন্ত্রিসভার অস্তিত্বও শেষ। সে ক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) এবং তাঁর মন্ত্রিসভা এখন আর কার্যকর সরকার নয়। তবে রাজ্যপাল তাঁকে আনুষ্ঠানিক ভাবে বরখাস্তও করেননি। আবার নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত ‘তদারকি মুখ্যমন্ত্রী’ হিসেবেও কাজ চালিয়ে যেতে বলেননি।
ফলে বৃহস্পতিবার রাত থেকে শনিবার শপথ অনুষ্ঠান পর্যন্ত রাজ্যের প্রশাসনিক কর্তৃত্ব নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। সংবিধান বিশেষজ্ঞদের একাংশ এই পরিস্থিতিকে ‘অভূতপূর্ব’ বলেই ব্যাখ্যা করছেন। তাঁদের মতে, সাধারণত কোনও সরকার ভোটে হারলে মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যপালের কাছে ইস্তফা দেন। কিন্তু এখানে সেই প্রথা মানা হয়নি। ফলে বাস্তবে এক ধরনের সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, সংবিধান অনুযায়ী রাজ্যের শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হয় রাজ্যপালের নামে। মন্ত্রিসভা তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে। কিন্তু এখন যেহেতু বিধানসভা ও মন্ত্রিসভা—দুইয়েরই অস্তিত্ব শেষ, তাই আপাতত সেই প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থাও নেই। এই পরিস্থিতিতে রাজ্যপাল সরাসরি নিজের সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন বলেই মত তাঁদের।
যদিও অনেকের মতে, অস্থায়ী সময়ের জন্য রাষ্ট্রপতির শাসন জারির পথও খোলা ছিল। কিন্তু সেই পথে হাঁটার ইঙ্গিত এখনও মেলেনি। অন্তত রাজভবনের তরফে সে রকম কোনও বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি।
লোক ভবনের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সংবিধানের ১৭৪ অনুচ্ছেদের ২ নম্বর ধারার ভিত্তিতেই বিধানসভা ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। প্রশাসনিক সূত্রে খবর, শুক্রবার বিজেপিকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানাতে পারেন রাজ্যপাল। বিজেপির বিধায়কদের সমর্থনের চিঠি হাতে পাওয়ার পর শনিবার নতুন সরকারকে শপথবাক্য পাঠ করানো হতে পারে।
ভোটের ফল প্রকাশের পর থেকেই অবশ্য ইস্তফা প্রসঙ্গে অনড় অবস্থান নিয়েছিলেন মমতা। তিনি বলেছিলেন, “কেন পদত্যাগ করব? আমরা তো হারিনি! জোর করে ভোট লুট করা হয়েছে। ইস্তফা দেওয়ার প্রশ্ন কেন উঠছে?” পাশাপাশি তাঁর মন্তব্য ছিল, “ওরা আমাকে বরখাস্ত করুক!”
কিন্তু সেই পথে না গিয়ে রাজ্যপাল শুধু বিধানসভা ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্তই কার্যকর করেছেন। আর তাতেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে এক বিরল সাংবিধানিক পরিস্থিতি, যা নিয়ে এখন জোর চর্চা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক ও আইনজ্ঞ মহলে।





