পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ফল প্রায় স্পষ্ট হতেই রাজনৈতিক চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এল এক অন্য প্রশ্ন—মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কবে ইস্তফা দেবেন? প্রচলিত রীতি বলছে, পরাজয়ের পর বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যপালের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। কিন্তু এবার সেই পথে হাঁটছেন না তিনি।
সোমবার ফল পরিষ্কার হওয়ার পর থেকেই জল্পনা ছিল, কখন রাজভবনে যাবেন মুখ্যমন্ত্রী। সন্ধ্যায় তিনি যখন অনুষ্ঠান সেরে বেরোলেন, অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, সেখান থেকে সরাসরি রাজ্যপালের কাছে যাবেন। কিন্তু তাঁর গাড়ির বহর ঘুরে যায় কালীঘাটের বাড়ির দিকে। পরদিন বিকেলে জল্পনার অবসান ঘটিয়ে স্পষ্ট বার্তা দেন তিনি—“কেন পদত্যাগ করব? আমরা তো হারিনি। জোর করে ভোট লুট করা হয়েছে। ইস্তফার প্রশ্ন আসছে কোথা থেকে?”
এই অবস্থান নতুন করে তুলেছে সাংবিধানিক বিতর্ক। সংবিধানে সরাসরি এমন পরিস্থিতির উল্লেখ নেই, যেখানে নির্বাচনে পরাজয়ের পরও মুখ্যমন্ত্রী ইস্তফা দিতে অস্বীকার করেন। কারণ, সাধারণত এটি আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, বরং দীর্ঘদিনের রেওয়াজ ও সাংবিধানিক শিষ্টাচার।
ইতিহাস বলছে, এই রীতিই এতদিন মেনে চলা হয়েছে। ২০১১ সালে পরাজয়ের পর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য রাজভবনে গিয়ে রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গান্ধী-র হাতে ইস্তফা তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু এবার সেই ধারার ব্যতিক্রম ঘটতে পারে।
তবে আইনের নিরিখে পরিস্থিতি স্পষ্ট। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বর্তমান মেয়াদ শেষ হচ্ছে ৭ মে। তার পর থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বিদায়ী সরকারের মেয়াদও শেষ হয়ে যাবে। অর্থাৎ, ইস্তফা না দিলেও ওই তারিখের পর আর মুখ্যমন্ত্রী পদে থাকবেন না মমতা। তাঁর নামের আগে যুক্ত হবে ‘প্রাক্তন’ তকমা।
এরই মধ্যে নতুন সরকার গঠনের প্রস্তুতিও শুরু করেছে বিজেপি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী-র বক্তব্যে ইঙ্গিত মিলেছে, ৯ মে—রবীন্দ্রজয়ন্তীর দিন—শপথগ্রহণ হতে পারে। দলীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কলকাতায় এসে পরিষদীয় দলের বৈঠকে নেতৃত্বের নাম চূড়ান্ত করতে পারেন। সেই নেতাই হবেন পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী এবং রাজ্যপালের কাছে সরকার গঠনের দাবি জানাবেন।
মধ্যবর্তী সময়ের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও রয়েছে কিছু সম্ভাবনা। সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রয়োজনে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীকে ‘কেয়ারটেকার’ হিসেবে কাজ চালানোর অনুরোধ করতে পারেন রাজ্যপাল। অন্যথায় স্বল্প সময়ের জন্য রাজ্যপাল নিজেই পরিস্থিতি সামলাতে পারেন, রাষ্ট্রপতির অনুমোদন নিয়ে। যদিও এত অল্প সময়ের জন্য রাষ্ট্রপতি শাসন জারির সম্ভাবনা খুবই কম বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।
সব মিলিয়ে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি এবার নজিরবিহীন এক সাংবিধানিক পরিস্থিতির মুখোমুখি পশ্চিমবঙ্গ। মমতার এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে রাজনৈতিক শিষ্টাচারের সংজ্ঞা বদলাবে কি না, সেই প্রশ্নই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।





