দেড় দশকের বেশি সময় পরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় পরিবর্তন। ক্ষমতা হারিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। আর সেই সঙ্গে সামনে এসেছে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—এবার কী করবেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়?
২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর হাত ধরে রাজ্যে ক্ষমতায় আসে তৃণমূল। সেই সময় থেকেই ধীরে ধীরে দলের অন্দরে উঠে আসেন অভিষেক। ২০১৪ সালে ডায়মন্ড হারবার থেকে সাংসদ হওয়ার পর তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্ব বাড়তে থাকে। পরবর্তী সময়ে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক পদ এবং সংগঠনের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণও তাঁর হাতে আসে। ফলে তৃণমূলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব হিসেবে তাঁর নাম কার্যত প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফল সেই সমীকরণে বড় ধাক্কা দিয়েছে। প্রথমবারের মতো সরাসরি বিরোধী আসনে বসতে হচ্ছে অভিষেককে। এতদিন যে রাজনীতি তিনি করেছেন, তার বড় অংশই ছিল ক্ষমতার পরিসরের মধ্যে। এখন সেই আরামদায়ক জায়গা নেই—এটাই রাজনৈতিক মহলের বড় আলোচ্য।
দলের অন্দরে জানা যাচ্ছে, মঙ্গলবার বিকেলে মমতা ও অভিষেক যৌথভাবে সাংবাদিক বৈঠক করবেন। সেখানে ভবিষ্যতের রূপরেখা স্পষ্ট হতে পারে। তবে ততক্ষণ পর্যন্ত জল্পনা চলছেই—তৃণমূল কি আগের পথে ফিরবে, নাকি নতুন কোনও কৌশল নেবে?
অভিষেকের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু থেকেই বিতর্কে ঘেরা। বিরোধীরা বরাবরই তাঁকে ‘পরিবারতন্ত্রের ফল’ বলে কটাক্ষ করেছেন। যদিও মমতা একাধিকবার বলেছেন, “অভিষেক অনেক ছোট থেকে রাজনীতি করে। ওর যখন দু’বছর বয়স, তখন একা একা বাড়িতে মিছিল করত আর স্লোগান দিত— দিদিকে মারলে কেন? সিপিএম জবাব দাও!”
দলের ভিতরে আবার অন্য চিত্রও ছিল। সংগঠনে ‘নতুন’ ভাবনা আনার চেষ্টা করেছিলেন অভিষেক। প্রার্থী বাছাই থেকে শুরু করে জেলা নেতৃত্বে পরিবর্তন—সব ক্ষেত্রেই তাঁর ছাপ স্পষ্ট। অনেক প্রবীণ নেতাকে সরিয়ে অপেক্ষাকৃত তরুণদের সামনে আনার কৌশল নিয়েছিলেন তিনি। এই ‘কর্পোরেট স্টাইল’ সংগঠন পরিচালনা নিয়ে সমালোচনাও কম হয়নি।
নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পরে সেই কৌশল নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অনেকের মতে, পরিবর্তনের চেষ্টা দেরিতে শুরু হওয়ায় তা ফলপ্রসূ হয়নি। আবার একাংশের দাবি, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসই বিপদ ডেকে এনেছে।
ভোটের আগে অভিষেকের আত্মবিশ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। জয়ের পর উদ্যাপনের কথাও বলেছিলেন প্রকাশ্যে। কিন্তু ফল ঘোষণার পর তাঁর সেই আত্মবিশ্বাসে ভাটা পড়েছে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।
এখন বড় প্রশ্ন—বিরোধী রাজনীতির কঠিন বাস্তবতায় কতটা মানিয়ে নিতে পারবেন তিনি? কারণ, রাজ্যে বিরোধী হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর নেই। যদিও তাঁর ঘনিষ্ঠদের দাবি, দিল্লির রাজনীতিতে তিনি বরাবরই বিজেপি-বিরোধী লড়াইয়ের মুখ ছিলেন এবং তদন্তকারী সংস্থার চাপও সামলেছেন।
তবু বাস্তবতা অন্য কথা বলছে। ক্ষমতা, প্রশাসনিক সহায়তা ও সংগঠনের শক্তি ছাড়া রাজনীতির লড়াই অনেক বেশি কঠিন। সেই লড়াইয়ে অভিষেক কতটা সফল হন, সেটাই এখন দেখার।
তৃণমূলের জন্য যেমন এটি আত্মসমালোচনার সময়, তেমনই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্যও এটি রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।





