২০ সাংসদের ‘আশ্রয়’ যে দলে, তার ঠিকানা এক গ্রামের বাড়ি! NCPI-র উত্থান কীভাবে?

On: Monday, June 15, 2026 1:53 PM
---Advertisement---

কয়েক দিন আগেও পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিসরে এই দলের নাম কার্যত অচেনাই ছিল। কিন্তু এক ঝটকায় জাতীয় রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ বা এনসিপিআই (NCPI)। কারণ, তৃণমূল কংগ্রেসের ২০ জন বিক্ষুব্ধ সাংসদ নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখতে যে দলকে বেছে নিয়েছেন, সেটিই এই এনসিপিআই।

আরও অবাক করা বিষয় হল, যে দলের নাম এখন সংসদীয় অঙ্কের কেন্দ্রে, তার মূল কার্যালয় কোনও বড় শহরে নয়, হাওড়ার সাঁকরাইলের হাটগাছা গ্রামের একটি বাড়িতে।

স্থানীয়দের দাবি, আজ যেখানে দলের কার্যালয়, সেখানে একসময় একটি ইটভাটা ছিল। ‘উমা ইটভাটা’ নামে পরিচিত সেই জায়গাটি পরে বিক্রি হয়ে যায়। নতুন মালিক সেখানে বাড়ি তৈরি করেন। কয়েক বছর পর সেই সম্পত্তি কিনে নেন শিউলি কুণ্ডু ও তাঁর পরিবার। এরপর থেকেই ওই ঠিকানাকে কেন্দ্র করে একাধিক সামাজিক ও সাংগঠনিক কার্যকলাপ শুরু হয়।

স্থানীয় সূত্রের বক্তব্য, বাড়িটির একাংশে দুঃস্থ মহিলাদের জন্য একটি আবাসন ও সমাজসেবামূলক উদ্যোগ চালানো হয়। সেখানে তাঁদের থাকা, খাওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার ব্যবস্থাও রয়েছে। বাড়ির চত্বরে শিশুদের জন্য ছোট পার্কও তৈরি করা হয়েছে। একই ঠিকানা থেকে ‘জাগো বিশ্ব’ নামে একটি স্থানীয় সংবাদপত্রও পরিচালিত হত। এনসিপিআই-র বিভিন্ন কর্মসূচি ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের খবর মূলত ওই পত্রিকাতেই প্রকাশিত হত বলে স্থানীয়দের দাবি।

নির্বাচন কমিশনের নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২০ জানুয়ারি এনসিপিআই একটি ‘রেজিস্টার্ড আনরেকগনাইজড পলিটিক্যাল পার্টি’ বা নিবন্ধিত অস্বীকৃত রাজনৈতিক দল হিসেবে স্বীকৃতি পায়। দলটির তহবিলে অনুদান হিসেবে জমা পড়েছিল মাত্র ১ লক্ষ ১৩ হাজার টাকা।

নিবন্ধনের কিছুদিনের মধ্যেই ত্রিপুরা বিধানসভা নির্বাচনকে রাজনৈতিক আত্মপ্রকাশের মঞ্চ হিসেবে বেছে নেয় দলটি। সাতটি আসনে প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও চার জনের মনোনয়ন বাতিল হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত তিন জন প্রার্থী নির্বাচনে লড়েন এবং গোটা রাজ্যে তাঁদের প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ছিল মাত্র ১,১৯৮। ফলাফলে কেউই জামানত রক্ষা করতে পারেননি।

এরপরই সামনে আসে অসন্তোষের অভিযোগ। ত্রিপুরায় দলের হয়ে লড়া কয়েক জন প্রার্থীর অভিযোগ, নির্বাচনের পর দলের শীর্ষ নেতৃত্ব রাজ্য ছেড়ে চলে যায় এবং তাঁদের সঙ্গে আর কোনও যোগাযোগ রাখেনি।

দলের রাজনৈতিক উপস্থিতি যে খুব সীমিত ছিল, তার প্রমাণ মিলেছে স্থানীয় নির্বাচনেও। হাওড়ার ঝড় হাট গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় এনসিপিআই এক জন প্রার্থী দিয়েছিল। স্থানীয়দের দাবি, ওই প্রার্থী ছিলেন কুণ্ডু পরিবারের পরিচালিত হোমেরই এক বাসিন্দা। নির্বাচনে তিনি মাত্র ৭৫টি ভোট পান।

দলের সাংগঠনিক কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে শিউলি কুণ্ডুর। সরকারি নথি অনুযায়ী, তিনি এনসিপিআই-র কোষাধ্যক্ষ। একই সঙ্গে ওই ঠিকানায় নিবন্ধিত আরও দু’টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও তিনি যুক্ত। একটি বেসরকারি সংস্থার ডিরেক্টর হিসেবে ২০২১ সাল থেকে কাজ করছেন তিনি। পাশাপাশি একটি সমাজসেবামূলক সংগঠনের সঙ্গেও ডিরেক্টর পদে যুক্ত রয়েছেন।

দলের সভাপতি পদে রয়েছেন উত্তিয়া কুণ্ডু, যিনি শিউলি কুণ্ডুর স্বামী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর কিছু পোস্টও রাজনৈতিক মহলে আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে। একটি পোস্টে তাঁকে পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে ছবি শেয়ার করতে দেখা গিয়েছে।

এনসিপিআই-র আর এক সভাপতি শান্তনু দে জানিয়েছেন, ত্রিপুরা নির্বাচনের পর থেকেই দলের ভিতরে মতবিরোধ বাড়তে থাকে। বিশেষ করে আর্থিক বিষয় নিয়ে বিরোধের জেরে সাংগঠনিক কার্যকলাপ প্রায় থমকে যায়। তাঁর কথায়, “আমি নেতৃত্বকে ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। কিন্তু অর্থ এবং পরিকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে সেই পরিকল্পনা এগোয়নি।”

এই পটভূমিতেই নতুন করে রাজনৈতিক তাৎপর্য পেয়েছে এনসিপিআই। কারণ, দলত্যাগ বিরোধী আইনের বিধিনিষেধ এড়াতে কোনও দলের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদকে অন্য কোনও রাজনৈতিক দলে একত্রে যোগ দিতে হয়। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, সেই সাংবিধানিক পথ খুঁজতেই বিক্ষুব্ধ তৃণমূল সাংসদরা বেছে নিয়েছেন এমন একটি দলকে, যার রাজনৈতিক অস্তিত্ব এতদিন প্রায় অদৃশ্য ছিল।

ফলে প্রশ্ন উঠছে, হাওড়ার এক গ্রামের বাড়ি থেকে পরিচালিত এই ক্ষুদ্র রাজনৈতিক সংগঠন কি শুধুই সাংসদদের জন্য একটি আইনি আশ্রয়, নাকি আগামী দিনে রাজ্যের রাজনীতিতে আরও বড় ভূমিকা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে? এখন সেই উত্তর খুঁজছে রাজনৈতিক মহল।

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now