কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দাপটে যখন প্রযুক্তি প্রতিদিন আরও স্মার্ট, দ্রুত এবং স্বয়ংক্রিয় হয়ে উঠছে, তখনই এক অদ্ভুত প্রবণতা নজর কেড়েছে প্রযুক্তি দুনিয়ার। চকচকে ল্যাপটপ, এআই-চালিত সফটওয়্যার কিংবা সর্বক্ষণ নজর রাখা স্মার্ট ডিভাইসের ভিড়ে একদল তরুণ ফিরতে চাইছে একেবারে অন্য পথে। তাঁদের নতুন পছন্দ ‘সাইবারডেক’— এমন এক কম্পিউটার, যা আধুনিক প্রযুক্তির প্রায় সব প্রচলিত ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ করছে।
কম্পিউটারের ইতিহাসে মানুষের শ্রম বাঁচানোর লক্ষ্যই ছিল প্রধান। জটিল গণনা সহজ করা থেকে শুরু করে তথ্য সংরক্ষণ— সবকিছুর জন্যই যন্ত্রের উপর নির্ভরতা বেড়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। কিন্তু প্রযুক্তির এই অতি-নির্ভরতার মধ্যেই একাংশ তরুণের মনে প্রশ্ন জেগেছে, মানুষ কি ধীরে ধীরে নিজের চিন্তাশক্তি এবং নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে?
সেখান থেকেই জনপ্রিয় হতে শুরু করেছে ‘সাইবারডেক’ সংস্কৃতি। এটি কোনও নির্দিষ্ট কোম্পানির তৈরি পণ্য নয়। বরং নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী পুরনো যন্ত্রাংশ, ভাঙা কিবোর্ড, ছোট স্ক্রিন, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক উপাদান জুড়ে তৈরি করা হয় এই বিশেষ ধরনের কম্পিউটার। দেখতে এলোমেলো হলেও এর দর্শন স্পষ্ট— প্রযুক্তি ব্যবহার করবে মানুষ, প্রযুক্তি মানুষকে ব্যবহার করবে না।
‘সাইবারডেক’ ধারণার শিকড় খুঁজতে গেলে পৌঁছতে হয় বিজ্ঞান কল্পকাহিনির জগতে। আশির দশকে প্রকাশিত এক জনপ্রিয় সাইবারপাঙ্ক উপন্যাসে এমন কম্পিউটারের উল্লেখ ছিল, যা ব্যবহার করে হ্যাকাররা ভার্চুয়াল জগতে প্রবেশ করত। সেই কল্পনার প্রযুক্তিকেই বাস্তবে রূপ দিতে শুরু করেছেন প্রযুক্তিপ্রেমী তরুণদের একাংশ।
এই প্রবণতার পিছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে আসছে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রশ্ন। বর্তমান সময়ে স্মার্টফোন, ল্যাপটপ বা বিভিন্ন অনলাইন পরিষেবা ব্যবহার করতে গেলে বিপুল পরিমাণ তথ্য সংস্থাগুলির হাতে পৌঁছে যায়। ব্যবহারকারীর অভ্যাস, পছন্দ, অবস্থান থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত নানা তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সাইবারডেকের সমর্থকদের দাবি, তাঁরা এমন একটি কম্পিউটার তৈরি করতে চান, যা এই নজরদারি সংস্কৃতি থেকে অনেকটাই মুক্ত।
তবে এর অর্থ এই নয় যে সাইবারডেক ইন্টারনেটবিহীন কোনও প্রযুক্তি। ওয়াই-ফাই, ব্লুটুথ, ওয়েব ব্রাউজিং, ই-মেল— সবই ব্যবহার করা যায়। পার্থক্য হল, ব্যবহারকারীর হাতে নিয়ন্ত্রণ বেশি থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই অপ্রয়োজনীয় সফটওয়্যার, বিজ্ঞাপন ট্র্যাকিং বা এআই-নির্ভর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা সেখানে থাকে না।
আরও একটি বিষয় তরুণদের আকৃষ্ট করছে। সাইবারডেক ব্যবহার করলে চাইলে সম্পূর্ণ অফলাইনেও কাজ করা যায়। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নোটিফিকেশন, অবিরাম বিজ্ঞাপন বা ডিজিটাল বিভ্রান্তি থেকে দূরে থেকে পড়াশোনা, লেখালিখি কিংবা গবেষণার কাজে মন দেওয়া সম্ভব।
প্রযুক্তির জগতে এই প্রবণতা আপাতত মূলস্রোতের বাইরে হলেও এর জনপ্রিয়তা ধীরে ধীরে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এটি আসলে প্রযুক্তিবিরোধী আন্দোলন নয়; বরং প্রযুক্তির উপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা। এআই-নির্ভর ভবিষ্যতের মাঝেও তাই একদল তরুণ মনে করিয়ে দিচ্ছে— সব সময় নতুনই শ্রেষ্ঠ নয়, কখনও কখনও স্বাধীনতাই সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি।







