রেলস্টেশনে দোকান বা স্টল মানেই মোটা অঙ্কের বিনিয়োগ, রাজনৈতিক যোগাযোগ কিংবা বিশেষ প্রভাব— এমন ধারণা বহু মানুষের মধ্যেই রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ভারতীয় রেলের বর্তমান নীতি সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে। নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে আবেদন করলে সাধারণ নাগরিকও এখন বৈধভাবে রেলস্টেশনে ব্যবসা করার সুযোগ পাচ্ছেন।
ভারতীয় রেল এবং আইআরসিটিসি বর্তমানে ই-টেন্ডার পদ্ধতির মাধ্যমে স্টল ও দোকান বরাদ্দ করে। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটিই অনলাইনভিত্তিক এবং স্বচ্ছ। ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সি যে কোনও ভারতীয় নাগরিক, যাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধমূলক অভিযোগ নেই, তিনি এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেন।
আবেদন করতে হয় সরকারি আইআরইপিএস পোর্টালের মাধ্যমে। সেখানে বিভিন্ন স্টেশনের জন্য প্রকাশিত টেন্ডারে অংশগ্রহণ করে স্টল বা দোকানের জন্য আবেদন করা যায়।
অনেকের ধারণা, রেলস্টেশনে ব্যবসা করতে গেলে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। তবে ছোট ও মাঝারি স্টেশনগুলির ক্ষেত্রে সেই ছবি অনেকটাই আলাদা। নদিয়ার শান্তিপুর স্টেশনের এক ব্যবসায়ীর অভিজ্ঞতা সেই কথাই তুলে ধরছে।
শান্তিপুরের বাসিন্দা রাজীব ভট্টাচার্য জানান, স্টেশনের একটি দোকানের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তিনি অনলাইনে আবেদন করেন এবং ই-টেন্ডারের মাধ্যমে ব্যবসার সুযোগ পান। তাঁর কথায়, “সাধারণ মানুষের মধ্যে ধারণা রয়েছে যে রেলস্টেশনে দোকান পেতে অনেক টাকা লাগে। কিন্তু সব ক্ষেত্রে তা সত্যি নয়। শান্তিপুর স্টেশনে বিশেষ প্রকল্পের আওতায় আমি বছরে প্রায় ২৪ হাজার টাকারও কম খরচে ব্যবসা করার সুযোগ পেয়েছি।”
তবে এই সুবিধার সঙ্গে কিছু নির্দিষ্ট শর্তও রয়েছে। বিশেষ প্রকল্পের আওতায় বরাদ্দ পাওয়া স্টলগুলিতে স্থানীয় হস্তশিল্প, কুটির শিল্পজাত পণ্য বা এলাকার ঐতিহ্যবাহী সামগ্রী বিক্রির উপর জোর দেওয়া হয়।
রাজীব ভট্টাচার্যের দোকানে যে পণ্য বিক্রি হয়, তার বেশিরভাগই স্থানীয় মহিলাদের হাতে তৈরি। প্লাস্টিকের শো-পিস, কৃত্রিম ফুল এবং নানা ধরনের সাজসজ্জার সামগ্রী তৈরি করেন শান্তিপুরের বাগচি বাগান এলাকার মহিলারা। ফলে এই উদ্যোগ শুধু একজন উদ্যোক্তার ব্যবসার সুযোগ তৈরি করেনি, বরং গ্রামীণ মহিলাদের জন্যও কর্মসংস্থানের নতুন দরজা খুলেছে।
রেল কর্তৃপক্ষের এই মডেল স্থানীয় উৎপাদনকে বৃহত্তর বাজারের সঙ্গে যুক্ত করতে সাহায্য করছে। প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রীর সামনে স্থানীয় শিল্পীদের তৈরি পণ্য পৌঁছে যাওয়ায় বিক্রির সম্ভাবনাও বাড়ছে।
শুধু দক্ষিণবঙ্গ নয়, উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনেও নিয়মিত নতুন টেন্ডার প্রকাশ করা হচ্ছে। নিউ জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি জংশন, নিউ মাল জংশনের মতো স্টেশনগুলিতে ই-অকশন ও টেন্ডারের মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তাদের ব্যবসার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
হকার উচ্ছেদ এবং অবৈধ ব্যবসা নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই রেলের এই উদ্যোগ নতুন বার্তা দিচ্ছে। নিয়ম মেনে আবেদন করলে এবং প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করতে পারলে স্বল্প খরচেই রেলস্টেশনে ব্যবসা শুরু করা সম্ভব। ফলে পুঁজি কম হলেও উদ্যোগ এবং সঠিক তথ্য থাকলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাও এখন রেল প্ল্যাটফর্মকে নিজেদের ব্যবসার নতুন ঠিকানা হিসেবে বেছে নিতে পারেন।







