রবিবার সন্ধ্যায় আচমকাই শোক নেমে আসে টলিপাড়ায়। দীঘার তালসারি সমুদ্রসৈকতে শ্যুটিং করতে গিয়ে মৃত্যু হল অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের। বয়স মাত্র ৪২। বাংলা সিনেমা, ধারাবাহিক এবং মঞ্চ—তিন ক্ষেত্রেই সমান দাপটের এই অভিনেতার এমন অকাল প্রয়াণে হতবাক ইন্ডাস্ট্রি। কিন্তু মৃত্যুর কারণ ঘিরে তৈরি হয়েছে একাধিক প্রশ্ন, যার উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।
পুলিশ সূত্রে জানা যাচ্ছে, সমুদ্রে শ্যুটিংয়ের জন্য কোনও অনুমতি নেওয়া হয়নি। তাদের দাবি, প্রথমে খবর আসে একজন ব্যক্তি নাকি বোট থেকে পড়ে গিয়েছেন। সেই তথ্যের ভিত্তিতে উদ্ধারকাজ শুরু হয়। দীর্ঘ সময় তল্লাশির পর দেহ উদ্ধার হয় বলে জানানো হয়েছে। তবে ঠিক কতক্ষণ ধরে খোঁজ চলেছিল, তা নিয়েও মতভেদ রয়েছে—কেউ বলছেন দেড় ঘণ্টা, কেউ আবার তিন ঘণ্টার কথাও উল্লেখ করছেন।
অন্যদিকে, প্রোডাকশন টিমের বয়ান সম্পূর্ণ আলাদা ছবি তুলে ধরছে। তাঁদের দাবি, হাঁটু-সমান জলে শ্যুটিং চলছিল। হঠাৎ জোয়ারের টানে পড়ে যান অভিনেতা। টেকনিশিয়ানরাই দ্রুত উদ্ধার করেন। তাঁদের কথায়, “চার-পাঁচ মিনিটের মধ্যেই তুলে আনা হয়। তখনও বেঁচে ছিলেন। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথেই অবস্থার অবনতি হয়।”

প্রযোজক লীনা গঙ্গোপাধ্যায় ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন না। তিনি বলেন, “এমন পরিস্থিতিতে কেউ ভালো থাকে কীভাবে? স্ক্রিপ্টে গভীর জলের কোনও সিন ছিল না। আমি শুনেছি অনেকেই ওকে জলে নামতে বারণ করেছিলেন, কিন্তু ও কারও কথা শোনেনি।” তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, এই শ্যুটিংয়ের পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
পরিচালক শুভাশিস মণ্ডলের বয়ানেও রয়েছে ভিন্নতা। তাঁর কথায়, “ড্রোন ক্যামেরায় শট নেওয়া হচ্ছিল। হাঁটু জলে শ্যুটিং হচ্ছিল। হঠাৎ করেই রাহুল আর শ্বেতা এগিয়ে যায়, তারপর ভারসাম্য হারায়। সঙ্গে সঙ্গেই উদ্ধার করা হয়। বোটে নয়, সৈকতের কাছেই শ্যুটিং চলছিল।” তিনি আরও জানান, সমুদ্রের জল খেয়ে ফেলেছিলেন অভিনেতা এবং তখনও তাঁর জ্ঞান ছিল।
প্রোডাকশন ম্যানেজার চন্দ্রশেখর চক্রবর্তী জানান, “তখন শুটিং প্যাকআপ হয়ে গিয়েছিল। ৫টা-সাড়ে ৫টা বাজে (সন্ধ্যা) তখন। ঘড়ি দেখার সময় ছিল না তখন আর। শিল্পীদের ছেড়ে দিচ্ছিলাম এক এক করে। অম্বরীশদা (ভট্টাচার্য), ভাস্করদার (বন্দ্য়োপাধ্যায়) গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে। তখনই ফোন আসে আমার কাছে। সঙ্গে সঙ্গে সৈকতে পৌঁছোই আমি। ওকে গাড়িতে তোলার পর আমি সামনে উঠলাম। লাল কাপড় নাড়াতে নাড়াতে হাসপাতাল পৌঁছোই। শহরে ঢোকার পর থেকেই যানজটের জন্য দেরি হয়ে যায়। রাস্তায় যেতে যেতে রাহুলের বুকে হাত বোলাচ্ছিল আমাদেরই টেকনিশিয়ানরা। যদি বাঁচানো যায়, সেই আশায়। প্রচণ্ড হাঁপাচ্ছিল রাহুল। হাসপাতালে যাওয়ার পথেই সম্ভবত হৃদ্রোগে আক্রান্ত হন রাহুল। ওই ২০-২২ মিনিটের মধ্যেই মারা যান তিনি।”
একজন প্রত্যক্ষদর্শীর কথায়, “শুনলাম শ্যুটিং হচ্ছে, তাই দাঁড়িয়ে যাই। সারাদিনই ওঁরা শ্যুটিং করছিলেন। মাঝে মাঝে বিরতি নিচ্ছিলেন। আমরা নায়ককে দেখেছি, চেয়ারে বসে থাকতে। গল্প করছিলেন। তারপরে আমরা একটু অটো স্ট্যান্ডের ওইদিকে গিয়েছিলাম। তারপরেই হঠাৎ চিৎকার চেঁচামেচি শুনে ছুটে আসি। শুনলাম, নায়ককে পাওয়া যাচ্ছে না। জলে তলিয়ে গিয়েছেন। খোঁজ চলছে। প্রায় ঘণ্টা ২ পরে খুঁজে পাওয়া যায়। এরপরে হাসপাতালে নিয়ে গেলে মৃত বলে ঘোষণা করা হয় তাঁকে। অনেকক্ষণ খুঁজে পাওয়া যায়নি ওঁকে, তেমনটাই শুনলাম।”
এই ঘটনার পর থেকেই সামনে আসছে একাধিক গুরুতর অভিযোগ। শ্যুটিং স্পটে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। লাইফগার্ড, লাইফ জ্যাকেট বা জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল কি? এমনকি সিপিআর জানা কেউ উপস্থিত ছিলেন কি না, তা নিয়েও স্পষ্ট তথ্য নেই।
টলিউডের একাধিক পরিচিত মুখ ইতিমধ্যেই নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তুলেছেন। অভিনেত্রী সুদীপ্তা চক্রবর্তী, রূপাঞ্জনা মিত্র এবং পরিচালক পারমিত মুন্সী—সকলেই ঘটনার পূর্ণ সত্য সামনে আনার পক্ষে সওয়াল করেছেন। আর্টিস্ট ফোরামও শ্যুটিং নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
রাহুলের মৃত্যু শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং গোটা ইন্ডাস্ট্রির নিরাপত্তা ব্যবস্থার ফাঁকফোকরকে সামনে এনে দিল। এখন প্রশ্ন একটাই—এটি নিছক দুর্ভাগ্য, নাকি একাধিক গাফিলতির ফল? তদন্তই দিতে পারে তার উত্তর।








