প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর একটি মন্তব্যেই কেঁপে উঠল দেশের গয়নার বাজার। বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারের উপর চাপ কমাতে দেশবাসীকে এক বছরের জন্য সোনা কেনাবেচা কমানোর আবেদন জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। আর সেই বক্তব্যের পরেই বাজারে ব্যাপক ধাক্কা খেল টাইটান, কল্যাণ জুয়েলার্স এবং সেনকো গোল্ডের মতো বড় গয়না সংস্থার শেয়ার।
দু’দিনে এই তিন সংস্থার সম্মিলিত বাজারমূল্য প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা কমেছে বলে বাজার সূত্রে খবর। সোমবার থেকেই শুরু হয় বিক্রির চাপ। প্রথম দিনেই প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বাজারদর হারায় সংস্থাগুলি। মঙ্গলবারও সেই ধারা অব্যাহত থাকে। আরও প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা কমে যায় তাদের সম্মিলিত মূল্য।
সবচেয়ে বেশি ধাক্কা খেয়েছে টাইটান। সোমবার প্রায় ৭ শতাংশ পড়ার পর মঙ্গলবার আরও ৪ শতাংশ নেমে যায় সংস্থার শেয়ারদর। একই ছবি কল্যাণ জুয়েলার্স এবং সেনকো গোল্ডের ক্ষেত্রেও। কল্যাণ জুয়েলার্সের শেয়ার সোমবার ৯ শতাংশ পড়েছিল, মঙ্গলবার আরও ৬ শতাংশ কমে। সেনকো গোল্ডের শেয়ারদরও টানা দ্বিতীয় দিনে বড় পতনের মুখে পড়ে।
বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধসের মূল কারণ প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মন্তব্য। হায়দরাবাদের একটি অনুষ্ঠানে নরেন্দ্র মোদী বলেন, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে। তার প্রভাব পড়ছে আমদানির খরচে। সোনা আমদানিতেও চাপ বাড়ছে, যা ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডারের উপর বাড়তি বোঝা তৈরি করছে। সেই কারণেই তিনি দেশবাসীকে আপাতত এক বছরের জন্য সোনা কেনা থেকে বিরত থাকার আবেদন জানান।
প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্য বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ, ভারতের গয়নার বাজার মূলত খুচরো ক্রেতাদের উপর নির্ভরশীল। সেখানে দীর্ঘ সময়ের জন্য চাহিদা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতেই বিনিয়োগকারীদের একাংশ শেয়ার বিক্রি শুরু করেন।
যদিও শিল্পমহলের একাংশের বক্তব্য, বাজারে আতঙ্কের আবহ তৈরি হলেও পরিস্থিতি এতটা সরল নয়। টাইটানের সাম্প্রতিক আর্থিক ফলাফলে রাজস্ব প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ছিল। তবে লাভের হার এবং গ্রস মার্জিন কিছুটা কমেছে। তার পরেও শেয়ারদর স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর আচমকাই পরিস্থিতি বদলে যায়।
এদিকে, সূত্রের খবর, পুরো পরিস্থিতি নিয়ে জুয়েলারি শিল্পের প্রতিনিধিরা প্রধানমন্ত্রীর দফতরের সঙ্গে আলোচনায় বসতে পারেন। কারণ, সোনা আমদানিকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই চাপ বাড়ছে ব্যাঙ্কিং ও বুলিয়ন সেক্টরেও।
রয়টার্সের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ভারতে সোনার আমদানি গত তিন দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামতে পারে। কারণ, সোনার উপর অতিরিক্ত কর সংক্রান্ত দাবির জেরে কয়েকটি ব্যাঙ্ক আমদানি প্রক্রিয়ায় সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। ‘ইন্ডিয়া বুলিয়ন অ্যান্ড জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর সচিব সুরেন্দ্র মেহতা জানিয়েছিলেন, শুল্ক সংক্রান্ত জটিলতার কারণেই কিছু ক্ষেত্রে চালান আটকে যাচ্ছে।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সোনা আমদানিকারক দেশ ভারত। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবর্ষে প্রতি মাসে গড়ে ৬০ টন সোনা আমদানি করেছে দেশ, যার মাসিক মূল্য প্রায় ৬০০ কোটি ডলার। ফলে সোনার বাজারে যে কোনও নীতিগত বা রাজনৈতিক বার্তার প্রভাব কতটা বড় হতে পারে, সাম্প্রতিক ঘটনাই তার ইঙ্গিত দিচ্ছে।








