১৩০ কোটি মানুষের প্রয়োজনীয় জল একাই খেয়ে নেবে AI? রাষ্ট্রপুঞ্জের রিপোর্টে বাড়ছে উদ্বেগ

On: Friday, June 12, 2026 7:54 PM
---Advertisement---

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আলোচনায় এতদিন সবচেয়ে বেশি উঠে এসেছে চাকরি হারানোর আশঙ্কা, তথ্য সুরক্ষা বা প্রযুক্তিগত নির্ভরতার প্রসঙ্গ। কিন্তু এবার সামনে এল আরও একটি উদ্বেগজনক দিক। রাষ্ট্রপুঞ্জের সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের ফলে বিশ্বজুড়ে জল ও বিদ্যুতের উপর বাড়ছে অভূতপূর্ব চাপ। আর সেই চাপ ভবিষ্যতে পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

জাপান-ভিত্তিক ইউনাইটেড নেশন্‌স ইউনিভার্সিটির গবেষকদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, এআই চালানোর জন্য ব্যবহৃত ডেটা সেন্টারগুলির শক্তি ও জলের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। গবেষণার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে এআই-নির্ভর ডেটা সেন্টারগুলির বার্ষিক বিদ্যুৎ ব্যবহার পৌঁছতে পারে ৯৪৫ টেরাওয়াট-ঘণ্টায়। এই পরিমাণ বিদ্যুৎ পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং নাইজেরিয়ার সম্মিলিত বার্ষিক চাহিদার সমতুল্য।

শুধু বিদ্যুৎ নয়, জলের ব্যবহারও চিন্তার কারণ হয়ে উঠছে। গবেষকদের অনুমান, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে চলতি দশকের শেষে এআই অবকাঠামো যে পরিমাণ জল ব্যবহার করবে, তা প্রায় ১৩০ কোটি মানুষের এক বছরের গৃহস্থালির প্রয়োজনের সমান হতে পারে।

প্রশ্ন উঠতে পারে, এআই প্রযুক্তিতে এত জল লাগে কেন? বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা, কম্পিউটিং অবকাঠামো পরিচালনার জন্য বিপুল বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। সেই বিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলে যন্ত্রাংশে তাপ উৎপন্ন হয়। সার্ভার ও প্রসেসরকে অতিরিক্ত উত্তাপ থেকে রক্ষা করতে প্রয়োজন হয় শীতলীকরণ ব্যবস্থার, যেখানে জলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই প্রসঙ্গে ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক শুভময় মৈত্র বলেন, “জল ও বিদ্যুতের বিপুল ব্যবহার কম্পিউটেশনে নতুন নয়। আইবিএম-এর মতো সংস্থা যখন ষাট বা সত্তরের দশকে বৃহৎ কম্পিউটার ব্যবস্থা তৈরি করছিল, তখনও যন্ত্রকে ঠান্ডা রাখার জন্য জল দরকার হত। তা না হলে যন্ত্রাংশ অতিরিক্ত উত্তাপে ক্ষতিগ্রস্তও হতে পারে। আমার মতে, এআই-কে আলাদা করে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো ঠিক হবে না। সমস্যাটিকে সার্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা প্রয়োজন।”

গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। এআই মডেলকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার তুলনায় দৈনন্দিন ব্যবহারের সময়ই বেশি বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে। মোট শক্তি ব্যবহারের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ব্যয় হচ্ছে ব্যবহারকারীদের প্রতিদিনের প্রশ্ন, নির্দেশ ও কাজের উত্তর দিতে গিয়ে। অর্থাৎ যত বেশি মানুষ এআই ব্যবহার করবেন, ততই বাড়বে শক্তির চাহিদা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই ব্যবহারের ধরনও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ লেখালিখি বা তথ্য অনুসন্ধানের তুলনায় ছবি তৈরি, ছবি বিশ্লেষণ বা ভিডিও-সংক্রান্ত কাজ অনেক বেশি শক্তি খরচ করে। ফলে ভবিষ্যতে এআই ব্যবহারের বিস্তার যত বাড়বে, ততই বাড়বে ডেটা সেন্টারের উপর চাপ।

রাষ্ট্রপুঞ্জের গবেষকেরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, এতদিন এআই-এর পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে আলোচনা মূলত কার্বন নিঃসরণ এবং বায়ুদূষণকে কেন্দ্র করেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু জল, বিদ্যুৎ এবং বৈদ্যুতিন বর্জ্যের মতো বিষয়গুলি তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পেয়েছে। অথচ এই ক্ষেত্রগুলিতেও দ্রুত বাড়ছে ঝুঁকি।

বিশেষ উদ্বেগের বিষয় বৈদ্যুতিন বর্জ্য। গবেষণা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে এআই-সম্পর্কিত অবকাঠামো থেকে বছরে প্রায় ২৫ লক্ষ টন ই-ওয়েস্ট উৎপন্ন হতে পারে। এই বিপুল বর্জ্যের বোঝা শেষ পর্যন্ত উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলির উপরই বেশি পড়তে পারে বলে আশঙ্কা বিজ্ঞানীদের।

আরও একটি বৈশ্বিক বৈষম্যের দিকও তুলে ধরা হয়েছে রিপোর্টে। বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ উন্নত এআই অবকাঠামো যুক্তরাষ্ট্র ও চিনের নিয়ন্ত্রণে। অন্যদিকে, ১৫০টিরও বেশি দেশে উল্লেখযোগ্য এআই পরিকাঠামোই নেই। ফলে প্রযুক্তির সুবিধা সীমিত কয়েকটি দেশের হাতে কেন্দ্রীভূত হলেও পরিবেশগত ক্ষতির প্রভাব পড়ছে অনেক বৃহত্তর অঞ্চলে।

অধ্যাপক শুভময় মৈত্রের মতে, “রাষ্ট্রপুঞ্জের সাম্প্রতিক গবেষণার তথ্য অবশ্যই উদ্বেগের এবং এটা ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তা। পরিবেশগত প্রভাবকে হালকা ভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, কম্পিউটেশন বা এআই-এর অগ্রগতি থামিয়ে দেওয়া সম্ভব। বরং রাষ্ট্র, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পক্ষেত্রকে একযোগে কাজ করে এমন প্রযুক্তি ও নীতি তৈরি করতে হবে, যাতে উন্নয়ন এবং পরিবেশ— দু’টির মধ্যে যুক্তিসঙ্গত ভারসাম্য বজায় থাকে।”

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আজ আধুনিক সভ্যতার অন্যতম চালিকাশক্তি। কিন্তু সেই প্রযুক্তির নেপথ্যে যে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ খরচ হচ্ছে, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে বলেই মনে করছেন গবেষকেরা। তাঁদের বক্তব্য, এআই-এর অগ্রগতি থামানো নয়, বরং তাকে আরও টেকসই এবং পরিবেশবান্ধব করে তোলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now