ধর্নামঞ্চে ‘গণ অনুপস্থিতি’! মমতার পাশে মাত্র ১৪ জন, জোড়াফুলের অন্দরে কি তবে বড়সড় ভাঙনের ইঙ্গিত?

On: Tuesday, June 2, 2026 11:55 PM
---Advertisement---

বিধানসভা নির্বাচনে অপ্রত্যাশিত ভরাডুবির ঠিক ২৮ দিন পর, এই প্রথমবার কলকাতার রাজপথে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে শামিল হলেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। হাতে সংবিধান নিয়ে, ধর্মতলার ওয়াই চ্যানেলের ধর্নামঞ্চ থেকে বিজেপিকে হারানোর নতুন পণও করলেন তিনি। কিন্তু রাজনীতির আঙিনায় মঙ্গলবার দুপুরের এই কর্মসূচির চেয়েও বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠল ধর্নাস্থলের ‘ফাঁকা’ ছবিটা। দলের চরম দুর্দিনে খোদ দলনেত্রীর পাশে দেখা গেল মাত্র ৮ জন বিধায়ক এবং ৬ জন সাংসদকে!

তৃণমূলের দুই বহিষ্কৃত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সন্দীপন সাহার ‘নেতৃত্বে’ যখন ঘাসফুল শিবিরে বড়সড় ফাটলের জল্পনা তুঙ্গে, ঠিক তখনই দলের জনপ্রতিনিধিদের এই ‘গণ অনুপস্থিতি’ বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করল।

কারা ছিলেন দলনেত্রীর পাশে?
মঙ্গলবারের এই হাইপ্রোফাইল ধর্না কর্মসূচিতে উপস্থিত বিধায়কদের তালিকায় ছিলেন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়, ফিরহাদ (ববি) হাকিম, মদন মিত্র, অশোক দেব, নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়, অসীমা পাত্র এবং কুণাল ঘোষ। অন্যদিকে সংসদীয় দলের তরফে লোকসভার দুই সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও মালা রায় এবং রাজ্যসভার চার সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন, দোলা সেন, সামিরুল ইসলাম ও নাদিমুল হক হাজির ছিলেন। মাত্র ১৪ জনের এই উপস্থিতি দেখে রাজনৈতিক মহলের প্রশ্ন, তবে কি শুধু পরিষদীয় দলই নয়, তৃণমূলের সংসদীয় দলটাও শেষ পর্যন্ত অটুট থাকবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে?

এরই মধ্যে জল্পনা আরও বাড়িয়েছেন সদ্য বহিষ্কৃত ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি স্পষ্ট ঘোষণা করে দিয়েছেন যে, বুধবার হাওড়া গ্রামীণ জেলায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসনিক বৈঠকে সেখানকার তৃণমূল বিধায়কেরা হাজির থাকবেন!

ধর্নামঞ্চ থেকে যা বললেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
সোনারপুরে আক্রান্ত তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর হামলার প্রসঙ্গ টেনে ধর্নাস্থল থেকে কড়া বার্তা দেন মমতা। তিনি বলেন, “ওটা গলির মধ্যে ছিল। হেলমেট না-দিলে পাথরটা ওর মাথায় লাগত।” এরপরই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়ে তাঁর দাবি, “যখন সিরিয়াস অবস্থায় রোগী নিয়ে গেলাম তখন সিইও-র থেকে অনুমতি নেওয়ার কথা বলছে। পুলিশ নার্সিং হোমকে থ্রেট করছে। পরে ট্রমা কেয়ারে ভর্তি করল। তখন হাসপাতালের সিইও আমার কাছে এলেন। শোভন চট্টোপাধ্যায়ও ছিল আমার সঙ্গে। আমাদের বললেন, মাফ করবেন। আর চাপ নিতে পারছি না। ভয় দেখানো হচ্ছে।”

বিজেপিকে রাজ্য থেকে উপড়ে ফেলার ডাক দিয়ে তিনি সোজাসুজি বলেন, “বিজেপি বাদে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক আছে। তবে বিজেপির যাঁরা বলেছেন, তাঁদের পাশেও ছিলাম… জিয়েঙ্গে তো বিজেপি কো হটাকে যায়েঙ্গে।” পুলিশের অনুমতি না দেওয়া প্রসঙ্গেও সুর চড়িয়ে তাঁর ঘোষণা, “আমাদের এখানে ধর্নায় মাইকের অনুমতি দেওয়া হয়নি। হ্যান্ড মাইক নিয়ে বলতে হচ্ছে। এ ভাবে আমাকে আটকাতে পারবে না। যেখানে পারব বসে পড়ব। বাবা সাহেব অম্বেডকরের মূর্তিতে মালা দিতে কি আমাকে আটকাতে পেরেছে না জানতে পেরেছে? সংবিধান নিয়ে গিয়েছিলাম। মহাত্মা গান্ধীর মূর্তিতে মালা দিয়ে শপথ নিলাম— এই অত্যাচার যত দিন চলছে, তত দিন মোকাবিলা করব। করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে।”

পাশাপাশি, বিধায়কদের সই-বিতর্ক ও সিআইডি তদন্ত নিয়ে মমতা বলেন, “আজ যাঁরা বলছেন, সই আমাদের নয়। আমার কাছে ভিডিয়ো রেকর্ড আছে। কেউ বড় অক্ষরে লেখেন, কেউ আবার সই করেন। তবে হাতের লেখা ওদের কি না, তা ফরেনসিক পরীক্ষা করিয়ে নিন। যদি কোনও বিভ্রান্তি থাকে তো ফরেনসিক করাতেই পারেন। কিন্তু তার জন্য বিরোধী দলনেতা বাছাই আটকায় না।”

‘কর্পোরেট তৃণমূল বৈশিষ্ট্য হারিয়েছে’, তোপ ঋতব্রতের
দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর প্রথমবার মুখ খুলে সরাসরি অভিষেকের দিকে আঙুল তুলেছেন উলুবেড়িয়ার বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “মমতা সকলের নেত্রী। পার্টি থেকে বহিষ্কৃত হতে পারি। মমতার প্রতি যে সম্মান ছিল, তাই থাকবে। তিনিই আমার নেত্রী।” তবে দলের বর্তমান হাল নিয়ে তাঁর কটাক্ষ, “মমতা যে পার্টি করেছিলেন, ঘটনাচক্রে কর্পোরেট রীতিতে চলতে গিয়ে সেই তৃণমূল বৈশিষ্ট্য হারিয়েছে। ২৬ দিন পরে বেরিয়ে গণপিটুনি বা চোরপিটুনি অভিষেক খেলেন। গতকাল থেকে আমি গদ্দার, বেইমান শুনছি, কিন্তু চোর-চোর শুনছি না।” সেই সঙ্গে উলুবেড়িয়ার পুরপ্রধান অভয় দাস ও প্রাক্তন মন্ত্রী পুলক রায়ের বিরুদ্ধেও একরাশ দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন তিনি।

অন্যদিক, বিধানসভার স্পিকারের সচিবালয়ে তৃণমূল বিধায়কদের চিঠি জমা না নেওয়া নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন কুণাল ঘোষ। তাঁর প্রশ্ন, “বিরোধীরা একটা চিঠি জমা দেব। স্পিকার নেই বলে কি চিঠি জমা পড়বে না? দেখা করবেন না, চিঠিও জমা পড়বে না? এটা কি ছেলেখেলা!” যারা এই মুহূর্তে দল ছাড়ছেন বা বিদ্রোহ করছেন, তাঁদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলেও দাগিয়ে দেন তিনি।

“দেড়শোটা লোকও আসেনি”, তীব্র কটাক্ষ শুভেন্দুর
ধর্মতলার এই ফ্লপ শো দেখে তারকেশ্বর থেকে তীব্র উপহাস করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, “একজন ছবি পাঠিয়েছিল… এত দুরবস্থা আমি জানতাম না! একঝুড়ি লোক… দেড়শোটা লোকও আসেনি। সাংবাদিকরাই ছিলেন দু’শো জন মতো। সাংবাদিকেরা না থাকলে তো আরও করুণ অবস্থা হত।” তৃণমূলের সই জাল-কাণ্ড নিয়ে কটাক্ষ করে তিনি আরও বলেন, “এদের যে হেরে যাওয়ার পরেও চুরির অভ্যাস কাটেনি, ‘ভেটেরান’ চোর এরা। এত প্রতিষ্ঠিত চোর দেখা যায় না।”

তারকেশ্বর মন্দিরে পুজো দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়ে দেন, মন্দির চত্বর থেকে এবার নীল-সাদা রং মুছে ফেলা হবে। আধ্যাত্মিকতার প্রতীক হিসেবে সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রঙে সাজানো হবে তারকেশ্বর।

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now