ভারতীয় সঙ্গীতজগতের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের অবসান। প্রয়াত আশা ভোঁসলে (Asha Bhosle)। মুম্বইয়ের একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি। তাঁর মৃত্যুতে শুধু বলিউড নয়, গোটা ভারতীয় সঙ্গীত জগতে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
দীর্ঘ আট দশকের কর্মজীবনে ২০টিরও বেশি ভাষায় ১২ হাজারের বেশি গান গেয়েছেন আশা ভোঁসলে। সেই অসামান্য অবদানের জন্য তাঁর নাম জায়গা করে নেয় গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসেও। হিন্দি থেকে বাংলা, মারাঠি থেকে আরও বহু ভাষায় তাঁর কণ্ঠ ছড়িয়ে পড়েছে প্রজন্মের পর প্রজন্মে।
তাঁর সঙ্গীতজীবনের শুরুটা কিন্তু সহজ ছিল না। মাত্র ১০ বছর বয়সে গান গাওয়া শুরু করেন তিনি। ১৯৪৩ সালে প্রথমবার একটি মারাঠি ছবিতে তাঁর কণ্ঠ শোনা যায়। পরে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “আমাকে আমার প্রথম গানটি একটি মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে রেকর্ড করতে হয়েছিল। আমি কাঁপছিলাম। আমি জানতাম না মাইক্রোফোন কী… যখন আমি আমার প্রথম গানটি গাইলাম, আমি বুঝতে পারলাম যে আমিও গাইতে পারি।”
বাবা দীননাথ মঙ্গেশকরের মৃত্যুর পর সংসারের দায় কাঁধে তুলে নিতে হয় তাঁকে ও তাঁর দিদি Lata Mangeshkar-কে। সেই সময় থেকেই পেশাদার গানের জগতে প্রবেশ। ১৯৪৮ সালে ‘চুনারিয়া’ ছবিতে প্রথম হিন্দি গানের সুযোগ পান তিনি।
ব্যক্তিগত জীবনে খুব অল্প বয়সেই বড় সিদ্ধান্ত নেন আশা। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি গণপতরাও ভোঁসলেকে বিয়ে করেন, যা পরিবার মেনে নেয়নি। সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে। পরে সন্তান জন্মের পর পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়।
তাঁর কেরিয়ারের মোড় ঘোরে ১৯৫৭ সালে। Mohammed Rafi-র সঙ্গে গাওয়া ‘উড়ে জব জব জুলফেন তেরি’ গানটি তাঁকে জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছে দেয়। এরপর একের পর এক হিট গান—‘পিয়া তু আব তো আজা’, ‘দিল চিজ কেয়া হ্যায়’—তাঁকে আলাদা পরিচিতি দেয়।
কিশোর কুমার (Kishore Kumar), (Manna Dey)-দের সঙ্গে যুগলবন্দি থেকে শুরু করে আর ডি বর্মন (R. D. Burman), এস ডি বর্মন (S. D. Burman), (O. P. Nayyar)-দের মতো সুরকারদের সঙ্গে কাজ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজের স্বতন্ত্র ছাপ রেখেছেন তিনি।
পরবর্তীতে এ আর রহমান (A. R. Rahman)-এর সঙ্গে ‘রঙ্গিলা’ ছবির গান গেয়ে নতুন প্রজন্মের কাছেও সমান জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন আশা।
পেশাগত সাফল্যের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনে ওঠাপড়াও কম ছিল না। প্রথম দাম্পত্য জীবনের টানাপোড়েনের পর তিনি সন্তানদের নিয়ে আলাদা হয়ে যান। পরে সুরকার আর.ডি. বর্মণের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নতুন মাত্রা পায়। যদিও সেই সম্পর্কও শেষ পর্যন্ত টেকেনি, তবুও তাঁদের বন্ধুত্ব অটুট ছিল।
একদিকে দিদি লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে গভীর পারিবারিক বন্ধন, অন্যদিকে পেশাগত প্রতিযোগিতা—এই দুইয়ের মধ্যে দিয়েই নিজের আলাদা সত্তা গড়ে তুলেছিলেন আশা ভোঁসলে। তাঁর কণ্ঠ, তাঁর বৈচিত্র্য, তাঁর সংগ্রাম—সব মিলিয়ে তিনি শুধু একজন গায়িকা নন, এক যুগের নাম।
তাঁর চলে যাওয়া সঙ্গীতের এক স্বর্ণযুগের অবসান বলেই মনে করছেন অনেকে।








