অবসর জীবনে আর্থিক চিন্তা এড়াতে আগে থেকেই সঠিক পরিকল্পনা করা জরুরি। বর্তমানে অবসরকালীন সঞ্চয়ের জন্য একাধিক সরকারি প্রকল্প রয়েছে। তবে সব প্রকল্প সবার জন্য সমান উপযোগী নয়। কারও জন্য NPS লাভজনক হতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে EPF বা PPF বেশি কার্যকর। তাই বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজের পেশা, আয়, বয়স এবং ভবিষ্যতের আর্থিক লক্ষ্য বিবেচনা করা প্রয়োজন।
দীর্ঘ সময় ধরে বিনিয়োগ করতে চাইলে ন্যাশনাল পেনশন সিস্টেম বা NPS জনপ্রিয় একটি বিকল্প। এই প্রকল্পে অর্থ শেয়ার বাজার এবং বন্ডে বিনিয়োগ করা হয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদে ভালো রিটার্নের সম্ভাবনা থাকলেও আয় নির্দিষ্ট নয়। উদাহরণ হিসেবে, ৩০ বছর বয়সে প্রতি মাসে ৫,০০০ টাকা করে বিনিয়োগ করে ৬০ বছর পর্যন্ত চালিয়ে গেলে এবং গড়ে ১০ শতাংশ বার্ষিক রিটার্ন মিললে অবসরের সময় প্রায় ১.১৩ কোটি টাকার তহবিল তৈরি হতে পারে। এর ৬০ শতাংশ করমুক্তভাবে তোলা যায়, আর বাকি অর্থ দিয়ে অ্যানুইটি কিনে মাসিক পেনশন পাওয়া যায়।
বেসরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফান্ড বা EPF অবসর পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এই প্রকল্পে কর্মী এবং নিয়োগকর্তা উভয়েই প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জমা করেন। সেই সঙ্গে সরকার সুদও দেয়। দীর্ঘ সময় নিয়মিত অবদান রাখলে অবসরের সময় বড় অঙ্কের সঞ্চয় গড়ে ওঠে।
যাঁরা ঝুঁকি নিতে চান না, তাঁদের জন্য পাবলিক প্রভিডেন্ট ফান্ড বা PPF নিরাপদ বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়। সরকার নির্ধারিত সুদের পাশাপাশি এই প্রকল্পে সুদ ও ম্যাচিউরিটির অর্থ করমুক্ত থাকে। বছরে ১.৫ লক্ষ টাকা করে বিনিয়োগ করলে ১৫ বছর পর উল্লেখযোগ্য তহবিল তৈরি করা সম্ভব। প্রয়োজনে অ্যাকাউন্টের মেয়াদও বাড়ানো যায়।
কম আয়ের মানুষ এবং নিশ্চিত পেনশন চাইলে অটল পেনশন যোজনা বা APY উপযুক্ত হতে পারে। ৬০ বছর বয়সের পরে প্রতি মাসে ১,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত নির্দিষ্ট পেনশন পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কম বয়সে প্রকল্পে যোগ দিলে মাসিক অবদানও কম হয়।
অসংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মীদের জন্য প্রধানমন্ত্রী শ্রম যোগী মানধন বা PM-SYM বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে। এই প্রকল্পে গ্রাহক যে পরিমাণ অর্থ জমা করেন, সরকারও সমপরিমাণ অর্থ জমা দেয়। ৬০ বছর বয়সের পরে প্রতি মাসে ৩,০০০ টাকা পেনশন দেওয়া হয়। পেনশনভোগীর মৃত্যুর পর তাঁর জীবনসঙ্গী ফ্যামিলি পেনশনের সুবিধাও পান।
অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের জন্য রয়েছে ইউনিফায়েড পেনশন স্কিম বা UPS। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে অবসরের পরে শেষ ১২ মাসের গড় বেসিক বেতনের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পেনশন পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে অবসর-পরবর্তী নিয়মিত আয়ের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটিমাত্র প্রকল্পের উপর নির্ভর না করে প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিক স্কিমের সমন্বয় করলে অবসর পরিকল্পনা আরও শক্তিশালী হয়। বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য EPF এবং NPS-এর সংমিশ্রণ কার্যকর হতে পারে। ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে NPS-এর পাশাপাশি PPF নিরাপদ ও দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ের সুযোগ দেয়। কম আয় বা অসংগঠিত ক্ষেত্রের কর্মীদের জন্য APY এবং PM-SYM নিয়মিত পেনশনের ভরসা হতে পারে। আর কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের জন্য UPS গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প।
অবসরকালীন তহবিলের লক্ষ্য নির্ধারণ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণভাবে, অবসরের পরে প্রতি মাসে যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হবে, তার অন্তত ২০০ থেকে ২৫০ গুণ সঞ্চয় রাখার পরামর্শ দেন আর্থিক বিশেষজ্ঞরা। যেমন, মাসিক ২০,০০০ টাকা খরচের পরিকল্পনা থাকলে অন্তত ৫০ থেকে ৬০ লক্ষ টাকার তহবিল গড়ে তোলার চেষ্টা করা উচিত। মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বিবেচনায় রেখে আরও বড় তহবিল তৈরি করা গেলে ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা অনেকটাই নিশ্চিত করা সম্ভব।






