কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে যখন বিনিয়োগের আগ্রহ তুঙ্গে, তখনই শেয়ারবাজারে বড় ধাক্কা। এক দিনেই প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৩.৩৫ লক্ষ কোটি টাকা উধাও হয়ে যাওয়ার দাবি ঘিরে তৈরি হয়েছে চাঞ্চল্য। এই বিপুল ক্ষতির প্রভাব পড়েছে এআইকেন্দ্রিক বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত লিওপোল্ড অ্যাসছেনব্রেনারের হেজ ফান্ডেও। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তাঁর আর্থিক তহবিল নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন করে অনিশ্চয়তা।
লিওপোল্ড অ্যাসছেনব্রেনারকে এআই দুনিয়ায় বিশেষভাবে পরিচিত করা হয়েছে তাঁর দীর্ঘদিনের এআইকেন্দ্রিক ভবিষ্যৎ ভাবনার জন্য। ২৪ বছর বয়সি এই যুবক একসময় মার্কিন প্রযুক্তি সংস্থা ওপেনএআইয়ে কাজ করতেন। চ্যাটজিপিটি নির্মাতা ওই সংস্থায় থাকাকালীন একাধিক গবেষণামূলক প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। পাশাপাশি নিয়মিত এআই নিয়ে লেখালেখিও করতেন।
লিওপোল্ডের বিশ্বাস ছিল, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশ্বের অর্থনীতি এবং প্রযুক্তি ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে। সেই ধারণাকে কেন্দ্র করেই পরবর্তী সময়ে তিনি নিজস্ব হেজ ফান্ড তৈরি করেন। এআই সংস্থাগুলির শেয়ারে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করে লগ্নিকারীদের বিপুল রিটার্ন দেওয়ার লক্ষ্য ছিল তাঁর।
শুরুর দিকে সেই কৌশল যথেষ্ট সাফল্যও এনে দেয়। অল্প সময়ের মধ্যে ফান্ডের আকার দ্রুত বাড়তে থাকে। ওয়াল স্ট্রিটের বিভিন্ন ব্রোকারেজ সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, একসময় ওই হেজ ফান্ডের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যায়। বিনিয়োগ থেকে রিটার্নের পরিমাণও ছিল উল্লেখযোগ্য।
তবে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে যখন সামনে আসে ফান্ডের ঋণনির্ভর বিনিয়োগের বিষয়টি। অভিযোগ ওঠে, এআই সংস্থাগুলির শেয়ার কেনার জন্য বিভিন্ন ব্যাঙ্ক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছিলেন লিওপোল্ড। ঋণের মাধ্যমে বিনিয়োগ বাড়ানোর ফলে হেজ ফান্ডের আকার আরও বড় হয়েছিল।
এই তথ্য সামনে আসার পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। অনেকেই নিজেদের টাকা তুলে নেওয়ার চেষ্টা শুরু করেন বলে দাবি করা হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঋণ পরিশোধের জন্য চিপ নির্মাতা এসকে হাইনিক্সের মতো সংস্থার শেয়ার বিক্রি করার প্রয়োজন পড়ে বলে জানা যায়।
এর পর থেকেই লিওপোল্ডের হেজ ফান্ডের পারফরম্যান্সে চাপ তৈরি হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের দাবি। সম্প্রতি একদিনে প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির হিসাব সামনে এসেছে। ভারতীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৩.৩৫ লক্ষ কোটি টাকা। এই অঙ্ক ওয়াল স্ট্রিটের দৈনিক ক্ষতির নিরিখে অত্যন্ত বড় বলে দাবি করা হচ্ছে।
শুধু লিওপোল্ডের ফান্ড নয়, এআইকেন্দ্রিক শেয়ারগুলির সামগ্রিক মূল্যায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। এআই সংস্থাগুলির শেয়ারে দীর্ঘদিন ধরে যে বিপুল বিনিয়োগ এবং মূল্যবৃদ্ধি দেখা গিয়েছে, তার পিছনে তৈরি হওয়া বুদবুদ এবার ফাটার পথে কি না, সেই প্রশ্নও তুলছেন বাজার বিশ্লেষকদের একাংশ।
এর আগে মার্কিন শেয়ারবাজারে বড় ক্ষতির নজির তৈরি করেছিল আর্চেগস ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট। ২০২১ সালের একটি ট্রেডিং সেশনে বিপুল ক্ষতির মুখে পড়েছিল সংস্থাটি। সেই ঘটনার জেরে জেপি মর্গান এবং মর্গান স্ট্যানলির মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলিও বড় ক্ষতির মুখে পড়েছিল। এবার লিওপোল্ডের হেজ ফান্ডের ক্ষতির অঙ্ক সেই পুরনো নজিরকেও ছাপিয়ে গিয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
তবে এআইকে কেন্দ্র করে বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি শেষ হয়ে যাচ্ছে এমনটা বলার সময় এখনও আসেনি। প্রযুক্তি সংস্থাগুলির আয়, এআই পরিষেবার বাস্তব ব্যবহার এবং ভবিষ্যৎ বৃদ্ধির সম্ভাবনার উপর নির্ভর করবে বাজারের পরবর্তী গতিপথ। তবে সাম্প্রতিক এই ধাক্কা যে এআইকেন্দ্রিক শেয়ারে অতিরিক্ত মূল্যায়ন এবং ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, তা স্পষ্ট।
শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ বাজারগত ঝুঁকিসাপেক্ষ। কোনও সংস্থার শেয়ারে বিনিয়োগের আগে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া এবং নিজের ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।






