কলকাতা-মুম্বইয়ের দিকে এগিয়ে আসছে সমুদ্র? বাড়ছে জলস্তর, বড় ঝুঁকিতে উপকূলের কোটিরও বেশি মানুষ

On: Wednesday, September 2, 2026 10:40 AM
---Advertisement---

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি নিয়ে ফের বড় সতর্কবার্তা দিল রাষ্ট্রপুঞ্জ। কলকাতা, মুম্বই ও ঢাকার মতো দক্ষিণ এশিয়ার একাধিক উপকূলবর্তী শহর আগামী দিনে জলবায়ু পরিবর্তনের বাড়তে থাকা প্রভাবের মুখে পড়তে পারে। রাষ্ট্রপুঞ্জের Secretary General-এর সাম্প্রতিক রিপোর্টে স্পষ্ট করা হয়েছে, সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি আর শুধুমাত্র ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়। ইতিমধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চলে তার প্রভাব দেখা যাচ্ছে।

সংবাদসংস্থা পিটিআইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার নিচু বদ্বীপ অঞ্চলে অবস্থিত কলকাতা, মুম্বই ও ঢাকা বিশেষ ভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, এই তিন শহরকে ঘিরে থাকা এলাকায় ১.৪ কোটিরও বেশি মানুষ ভবিষ্যতে স্থায়ী জলমগ্নতার কারণে বসতভিটা হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন।

তবে এর অর্থ এই নয় যে অদূর ভবিষ্যতেই কলকাতা বা মুম্বই সমুদ্রের নীচে চলে যাবে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা মূলত দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনকে ঘিরে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ক্রমশ বাড়তে থাকলে আগামী কয়েক দশক ধরে উপকূলবর্তী শহরগুলিতে বন্যা, জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা এবং পরিকাঠামোগত ক্ষতির ঝুঁকি বাড়তে পারে।

কেন বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা?
বিজ্ঞানীদের মতে, এর পিছনে প্রধানত দুটি কারণ রয়েছে। বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে হিমবাহ এবং মেরু অঞ্চলের বরফের চাদর দ্রুত গলছে। সেই জল সমুদ্রে গিয়ে জমছে। পাশাপাশি সমুদ্রের জল উষ্ণ হয়ে উঠলে তা প্রসারিত হয়। এই দুই প্রক্রিয়াই বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

এর মূল কারণগুলির মধ্যে অন্যতম মানুষের তৈরি গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা যত বাড়ছে, ততই বরফ গলার পাশাপাশি সমুদ্রের উষ্ণতা বাড়ছে।

রাষ্ট্রপুঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বিশ্বে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা গড়ে প্রতি বছর প্রায় ৪.৭ মিলিমিটার করে বেড়েছে। ২০২৪ সালে এক বছরেই এই বৃদ্ধির হার পৌঁছেছিল প্রায় ৫.৯ মিলিমিটারে। অর্থাৎ পরিস্থিতি যে ক্রমশ আরও উদ্বেগজনক হচ্ছে, সেই ইঙ্গিত মিলছে পরিসংখ্যানেই।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা WMO-এর ২০২৫ সালের তথ্যেও একই প্রবণতা ধরা পড়েছে। ২০১২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধির গড় হার ছিল প্রায় ৪.৭৫ মিলিমিটার প্রতি বছর। ১৯৯৩ থেকে ২০১১ সালের সময়কালের তুলনায় এই হার উল্লেখযোগ্য ভাবে বেশি।

কলকাতার মতো শহরে ঝুঁকি বেশি কেন?
কলকাতা, মুম্বই এবং ঢাকার ক্ষেত্রে বিপদের কারণ শুধুমাত্র সমুদ্রের জলস্তর বাড়া নয়। এই শহরগুলির বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিচু বদ্বীপ ও উপকূলীয় এলাকায় অবস্থিত। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে জলোচ্ছ্বাস, উপকূলীয় বন্যা এবং কোথাও কোথাও ভূমি বসে যাওয়ার মতো ঘটনা একসঙ্গে ঘটলে ঝুঁকি অনেকটাই বেড়ে যেতে পারে।

বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড় বা প্রবল জলোচ্ছ্বাসের সময়ে সমুদ্রের জল স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি দূর পর্যন্ত স্থলভাগে ঢুকে পড়তে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা আগে থেকেই বেড়ে গেলে সেই জল আরও সহজে নিচু এলাকায় পৌঁছতে পারে।

শুধু বাড়িঘর নয়, বিপদে মিষ্টি জলও
সমুদ্রের জল বাড়ার প্রভাব শুধু বসতবাড়ি বা রাস্তাঘাটে সীমাবদ্ধ থাকবে না। উপকূলীয় এলাকায় মাটির নীচের মিষ্টি জলের স্তরে নোনা জল ঢুকে পড়ার আশঙ্কাও বাড়বে। এর ফলে ভূগর্ভস্থ জলের লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেতে পারে।

তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে পানীয় জল, কৃষিকাজ এবং সেচ ব্যবস্থায়। একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ জলের উপর নির্ভরশীল বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

অর্থাৎ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি শুধুমাত্র জল ঢুকে পড়ার সমস্যা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মানুষের খাদ্য, পানীয় জল, স্বাস্থ্য, বাসস্থান এবং জীবিকার নিরাপত্তা।

স্বাস্থ্যব্যবস্থার উপরও বাড়বে চাপ
উপকূলীয় এলাকায় বন্যা এবং জলাবদ্ধতা বাড়তে থাকলে স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর উপরেও চাপ তৈরি হতে পারে। রাষ্ট্রপুঞ্জের রিপোর্টে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, উপকূলীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং sanitation infrastructure ক্ষতিগ্রস্ত হলে জলবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে পানীয় জলের সংকট, দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর আশঙ্কা এবং দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপও বাড়তে পারে।

বিশ্বজুড়ে কত মানুষ ঝুঁকিতে?
রাষ্ট্রপুঞ্জের তথ্য বলছে, বিশ্বে প্রায় ৭৭ কোটি মানুষ সমুদ্রের উচ্চ জোয়ারের রেখা থেকে ৫ মিটারেরও কম উচ্চতায় বসবাস করেন। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব শুধুমাত্র কয়েকটি শহর বা দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় জনবসতি এর আওতায় পড়ছে।

তবে ভবিষ্যতের পরিস্থিতি পুরোপুরি নির্ধারিত নয়। বিশ্ব উষ্ণায়ন কতটা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে এবং উপকূলীয় শহরগুলি কত দ্রুত নিজেদের পরিকাঠামোকে জলবায়ু পরিবর্তনের উপযোগী করে তুলতে পারছে, তার উপর অনেকটাই নির্ভর করবে ঝুঁকির মাত্রা।

সমুদ্রপৃষ্ঠের কিছুটা বৃদ্ধি এখন আর পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয়। কিন্তু আগামী দিনে সেই বৃদ্ধি কতটা ভয়াবহ আকার নেবে, তা নির্ভর করছে বর্তমান সময়ের জলবায়ু নীতি, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর উদ্যোগ এবং উপকূলীয় অঞ্চলের প্রস্তুতির উপর। ফলে কলকাতার মতো শহরের সামনে প্রশ্নটি এখন সমুদ্র শহরের দোরগোড়ায় পৌঁছবে কি না, শুধু তা নয়। বরং সমুদ্রের বাড়তে থাকা প্রভাব মোকাবিলায় শহর কতটা প্রস্তুত, সেটিই হয়ে উঠছে বড় প্রশ্ন।

Join WhatsApp

Join Now

Join Telegram

Join Now