গরম বাড়লেই বাড়ে AC চালানোর খরচ। বিদ্যুতের বিলের চাপ সামলাতে গিয়ে অনেক পরিবারকেই কুলিংয়ের ক্ষেত্রে আপস করতে হয়। এবার সেই সমস্যারই বিকল্প পথ দেখাচ্ছে স্পেনের একদল গবেষকের তৈরি নতুন ন্যানোম্যাটেরিয়াল। দাবি করা হচ্ছে, সূর্যের আলোয় থাকা কোনও পৃষ্ঠকে কোনও বিদ্যুৎ ব্যবহার না করেই উল্লেখযোগ্যভাবে ঠান্ডা করতে পারে এই উপাদান।
স্পেনের Institute of Micro and Nanotechnology-এর গবেষকদের তৈরি এই প্রযুক্তি প্যাসিভ রেডিয়েটিভ কুলিংয়ের নীতিতে কাজ করে। পরীক্ষায় বিশেষভাবে তৈরি পৃষ্ঠের তাপমাত্রা সাধারণ কোটিং করা হয়নি এমন পৃষ্ঠের তুলনায় সর্বোচ্চ ১২.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম পাওয়া গিয়েছে।
বিদ্যুৎ ছাড়াই ঠান্ডা করার রহস্য কোথায়
এই প্রযুক্তির মূল ধারণা হল প্যাসিভ রেডিয়েটিভ কুলিং। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ইনফ্রারেড বিকিরণের একটি নির্দিষ্ট পরিসর রয়েছে, যাকে সাধারণভাবে atmospheric window বলা হয়। প্রায় ৮ থেকে ১৩ মাইক্রোমিটারের এই তরঙ্গদৈর্ঘ্যের মাধ্যমে তাপ বায়ুমণ্ডল পেরিয়ে মহাকাশের দিকে বেরিয়ে যেতে পারে।
গবেষকদের তৈরি উপাদান সেই বৈশিষ্ট্যকেই কাজে লাগায়। একদিকে এটি সূর্যের বিকিরণের বড় অংশ প্রতিফলিত করে, অন্যদিকে পৃষ্ঠ থেকে নির্গত তাপকে এই atmospheric window দিয়ে মহাকাশের দিকে পাঠাতে সাহায্য করে। ফলে কোনও কম্প্রেসর, মোটর বা বিদ্যুৎচালিত কুলিং সিস্টেম ছাড়াই পৃষ্ঠের তাপমাত্রা কমানো সম্ভব হয়।
কোন উপাদান দিয়ে তৈরি
গবেষণায় পলিভিনাইলিডিন ফ্লোরাইড বা PVDF নামে একটি পলিমার ব্যবহার করা হয়েছে। ইনফ্রারেড বিকিরণের মাধ্যমে তাপ নির্গমনের ক্ষেত্রে এই পলিমারের কার্যকারিতা আগে থেকেই বিজ্ঞানীদের জানা ছিল।
কুলিং প্রকল্পের প্রধান ক্রিস্টিনা ভিসেন্টে বলেন, “এই উপাদানটি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের দুর্দান্ত সমন্বয় নিয়ে তৈরি।”
শুধু তাপ নির্গমন নয়, উপাদানটির আরও কিছু সুবিধার কথা জানিয়েছেন গবেষকরা। এটি অতিবেগুনি রশ্মি সহ্য করতে পারে এবং জল প্রতিরোধী হওয়ায় বাইরের পরিবেশে ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সুবিধা রয়েছে। গবেষকদের মতে, এই বৈশিষ্ট্যের কারণে উপাদানটির উপর ময়লা বা জলের প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে।
ন্যানোস্কেলের নকশাই বড় চমক
এই প্রযুক্তির কার্যকারিতার পিছনে শুধু ব্যবহৃত পলিমার নয়, তার ন্যানোস্কেল কাঠামোরও বড় ভূমিকা রয়েছে। গবেষকরা PVDF পলিমারকে অ্যানোডাইজড অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইডের ন্যানোপোরাস টেমপ্লেটের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে একটি ত্রিমাত্রিক কাঠামো তৈরি করেছেন।
এই কাঠামোর জ্যামিতি ন্যানোমিটার স্তরে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এর ফলে উপাদানটির আলো প্রতিফলন এবং তাপ বিকিরণের বৈশিষ্ট্যকে নির্দিষ্টভাবে সাজানো সম্ভব হয়েছে।
গবেষণার ফল অনুযায়ী, প্রক্রিয়াজাত করার পর তৈরি উপাদানটি গড়ে ৮২.৪ শতাংশ সৌর বিকিরণ প্রতিফলিত করতে পারে। অর্থাৎ সূর্যের আলো থেকে তাপ শোষণ কমানোর পাশাপাশি পৃষ্ঠের তাপ মহাকাশের দিকে বিকিরণ করার সুযোগ তৈরি হয়।
মাদ্রিদে পরীক্ষা, কমল ১২.৯ ডিগ্রি
তত্ত্বের বাইরে গিয়ে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়েছে মাদ্রিদের Tres Cantos এলাকায়। গত বছর একটি ভবনের ছাদে বাস্তব পরিবেশে নমুনাটি পরীক্ষা করেন গবেষকরা।
তীব্র রোদ এবং শুষ্ক আবহাওয়ার মধ্যে পরীক্ষায় বিশেষভাবে UV ট্রিটমেন্ট করা নমুনাটি উল্লেখযোগ্য ফল দেয়। কোনও বিশেষ কোটিং না থাকা তুলনামূলক পৃষ্ঠের চেয়ে পরীক্ষাধীন পৃষ্ঠটির তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ১২.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম পাওয়া যায়।
তবে এখানেই গবেষণা শেষ নয়। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, প্রযুক্তিটি এখনও উন্নয়নের পর্যায়ে রয়েছে। বাস্তব ব্যবহারের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব, বড় এলাকায় প্রয়োগ এবং বিভিন্ন আবহাওয়ায় কার্যকারিতা আরও পরীক্ষা করতে হবে।
AC-এর বিকল্প হতে পারবে?
বিশ্বজুড়ে কুলিংয়ের জন্য বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। ফলে বিদ্যুৎ ছাড়াই ভবন বা অন্য কোনও পৃষ্ঠ ঠান্ডা করার প্রযুক্তি সফল হলে তার সম্ভাব্য ব্যবহার যথেষ্ট বড়।
গবেষকদের মতে, এই ন্যানোম্যাটেরিয়াল ভবিষ্যতে বাড়ির ছাদ, গাড়ি কিংবা বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ক্ষেত্রে কাজে লাগানো যেতে পারে। প্রযুক্তিটি বাণিজ্যিকভাবে সফল হলে AC বা অন্যান্য সক্রিয় কুলিং ব্যবস্থার উপর নির্ভরতা কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে এখনই AC-এর সম্পূর্ণ বিকল্প হিসেবে এই প্রযুক্তিকে দেখার সময় আসেনি। গবেষণাটি এখনও উন্নয়নের পর্যায়ে। কিন্তু বিদ্যুৎ ব্যবহার না করে সূর্যের তাপের মধ্যেই কোনও পৃষ্ঠকে উল্লেখযোগ্যভাবে ঠান্ডা করার এই পদ্ধতি ভবিষ্যতের কম-বিদ্যুৎ নির্ভর কুলিং প্রযুক্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি করেছে।







