এক দশকের ব্যবধানে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এমন এক পরিবর্তন ঘটেছে, যা শুধু সংখ্যার হিসেব নয়, বরং গোটা রাজনৈতিক কাঠামোকেই নতুন করে সাজিয়েছে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিজেপি (BJP)-র উত্থান—একসময় যাদের উপস্থিতি ছিল প্রায় অদৃশ্য, তারাই ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে রাজ্যের প্রধান বিরোধী শক্তি।
২০১১ সালে যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)-র নেতৃত্বে তৃণমূল (All India Trinamool Congress) বামফ্রন্টকে সরিয়ে ক্ষমতায় আসে, তখন বিজেপির ভূমিকা ছিল কার্যত নগণ্য। ভোটের হার ছিল সামান্য, সংগঠন সীমিত, এবং রাজনৈতিক লড়াইয়ে তাদের উপস্থিতি ছিল প্রান্তিক। কিন্তু সেই সময়ই অদৃশ্যভাবে শুরু হচ্ছিল এক দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বিন্যাস, যার ফল সামনে আসে পরবর্তী দশকে।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান ছিল গভীর ও বিস্তৃত, যা কোনওভাবেই শুধু শহরকেন্দ্রিক ছিল না। ২০১১ সালে ৪.০৬ শতাংশ ভোট থেকে ২০২১-এ ৩৭.৯৭ শতাংশে পৌঁছে দলটি এক দশকে প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে। এই বৃদ্ধি কেবল প্রচারের ফল নয়, বরং ভোটারদের অবস্থান বদলের ইঙ্গিত। তবে একই সঙ্গে এটি বাম ও কংগ্রেসের মতো পুরনো বিরোধী শক্তির পতনের ফল, যার ফলে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক শূন্যস্থানই বিজেপির উত্থানের পথকে সহজ করেছে।
২০১৬ সালে প্রথমবারের মতো বিজেপির উত্থানের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়। ভোটের শতাংশ বাড়ে, কিছু আসনও আসে তাদের ঝুলিতে। যদিও তা তখনও ক্ষমতার সমীকরণ পাল্টানোর মতো ছিল না, তবুও বোঝা যাচ্ছিল—বিরোধী ভোটের একটি অংশ নতুন আশ্রয় খুঁজছে।
বিজেপির এই উত্থানের নেপথ্যে বড় ভূমিকা রয়েছে বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের দ্রুত পতনের। ২০১১ সালে যেখানে বামফ্রন্টের ভোট ৪০ শতাংশের বেশি ছিল, ২০২১-এ তারা কার্যত প্রাসঙ্গিকতা হারায়, কংগ্রেসও একইভাবে পিছিয়ে পড়ে। ফলে তৃণমূল বিরোধী ভোট, যা আগে বিভিন্ন দলে ছড়িয়ে ছিল, ধীরে ধীরে একজোট হয়ে বিজেপির দিকে সরে আসে। অর্থাৎ বিজেপির উত্থান শূন্য থেকে নয়, বরং ভেঙে পড়া বিরোধী কাঠামোর জায়গা দখল করেই। তবে এই পরিবর্তন সব জায়গায় একরকম হয়নি—কোথাও কংগ্রেসের পতন বেশি প্রভাব ফেলেছে, কোথাও বামের দুর্বলতা, আবার অনেক ক্ষেত্রে দুইয়ের মিশ্র প্রভাবেই নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে।
আসল পরিবর্তন ঘটে ২০২১-এ। এই নির্বাচনে বিজেপি শুধু ভোট বাড়ায়নি, বরং গোটা রাজ্যজুড়ে নিজেদের একটি বিকল্প শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। বহু আসনে তারা সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলে এবং এক লাফে বিধানসভায় উল্লেখযোগ্য আসনসংখ্যা অর্জন করে। ৩৮ শতাংশ ভোট পায় বিজেপি। ২৯৪ আসনের মধ্যে ৭৭ আসনে জয়লাভ করে গেরুয়া শিবির। বিজেপি হয়ে ওঠে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল। ফলে স্পষ্ট হয়ে যায়, বিজেপি আর প্রান্তিক শক্তি নয়, বরং তৃণমূলের একমাত্র কার্যকর প্রতিপক্ষ।
তবে এই উত্থানকে শুধুমাত্র বিজেপির সংগঠন বা প্রচারের সাফল্য হিসেবে দেখলে চিত্রটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এর পেছনে রয়েছে আরও বড় একটি প্রক্রিয়া—পুরনো বিরোধী শক্তির পতন। দীর্ঘদিন বাংলার রাজনীতিতে বিরোধিতার মুখ ছিল বামফ্রন্ট এবং কংগ্রেস। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই দুই শক্তির প্রভাব কমতে থাকে। তাদের সংগঠন দুর্বল হয়, ভোটভিত্তি ভেঙে যায় এবং সেই শূন্যস্থান দ্রুত পূরণ করে বিজেপি।
ফলে বিরোধী ভোট, যা আগে বিভিন্ন দলে বিভক্ত ছিল, তা ধীরে ধীরে এককভাবে বিজেপির দিকে সরে আসে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, যেখানে আগে বাম বা কংগ্রেস ছিল প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, সেখানে বিজেপি সরাসরি সেই জায়গা দখল করেছে। এই পরিবর্তন ছিল সমগ্র রাজ্যজুড়ে, যদিও তার তীব্রতা অঞ্চলভেদে আলাদা।
বিশেষ করে পূর্ব মেদিনীপুর, কোচবিহার, পুরুলিয়া, দার্জিলিং, বাঁকুড়া ও নদিয়ার মতো জেলাগুলিতে বিজেপির উত্থান ছিল আরও স্পষ্ট। এইসব এলাকায় শুধু ভোটের হারই বাড়েনি, বরং স্থানীয় স্তরে সংগঠনও শক্তিশালী হয়েছে। অনেক আসনে ভোটের লাফ ছিল এতটাই বেশি যে তা এক নির্বাচনের মধ্যেই রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিয়েছে।
তবে এই পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যেও একটি বিষয় স্পষ্ট—বিজেপির উত্থান মানেই তৃণমূলের পতন নয়। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধি এসেছে বিরোধী ভোটের পুনর্বিন্যাস থেকে, শাসক দলের মূল ভোটব্যাঙ্কে বড় ধরনের ভাঙন না ঘটিয়েই। এখানেই তৃণমূলের রাজনৈতিক দক্ষতা চোখে পড়ে। তারা নিজেদের সমর্থন ধরে রেখে ভোটকে আসনে রূপান্তর করতে সক্ষম হয়েছে অনেক বেশি কার্যকরভাবে। ফলে ২০২১-এর ফলাফল একটি দ্বৈত বাস্তবতা সামনে আনে। একদিকে বিজেপি শক্তিশালী বিরোধী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, অন্যদিকে তৃণমূল তার আধিপত্য বজায় রাখতে সফল।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান কোনও একক কারণের ফল নয়। এটি একদিকে সংগঠন ও কৌশলের বিস্তার, অন্যদিকে পুরনো রাজনৈতিক কাঠামোর ভাঙনের সুযোগকে কাজে লাগানোর ফল। এই দ্বিমুখী প্রক্রিয়াই এক দশকে রাজ্যের রাজনীতিকে নতুন আকার দিয়েছে।





