চিনি কিনতে গিয়ে হঠাৎই বাড়তি খরচের মুখে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে বাজারে চিনির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এক মাস আগেও যেখানে প্রতি কেজি চিনি প্রায় ৪৫ টাকায় পাওয়া যাচ্ছিল, এখন সেই দাম বেড়ে প্রায় ৬৫ টাকা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। ফলে শুধু রান্নাঘরের মাসিক বাজেট নয়, মিষ্টি-সহ চিনি দিয়ে তৈরি একাধিক খাদ্যপণ্যের দাম নিয়েও নতুন করে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বাজারে সরবরাহ বাড়িয়ে দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। এক দশকের মধ্যে এই প্রথম বিপুল পরিমাণ চিনি আমদানির পথে হাঁটছে কেন্দ্র।
১০ লাখ টন চিনি আমদানির সিদ্ধান্ত
ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় চিনি উৎপাদক এবং উৎপাদনের দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। সাধারণত দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পরও পর্যাপ্ত চিনি উৎপাদিত হয়। কিন্তু এবার বাজারে দাম বৃদ্ধির পরিস্থিতি সামাল দিতে ১০ লাখ টন চিনি আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রের লক্ষ্য, অতিরিক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করে বাজারে দামের চাপ কমানো। চলতি সময়ে শুরু করে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত আমদানি প্রক্রিয়া চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
উৎসবের মরশুমের আগে কেন এই পদক্ষেপ
সেপ্টেম্বর-অক্টোবর থেকেই দেশে উৎসবের মরশুম শুরু হয়। এই সময় মিষ্টি-সহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যে চিনির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বাজারে চাহিদাও দ্রুত বাড়ে। সেই সময় সরবরাহে কোনও ঘাটতি যাতে তৈরি না হয়, তা নিশ্চিত করতেই আমদানির সিদ্ধান্ত বলে মনে করা হচ্ছে।
শুধু আমদানি নয়, চিনির মজুত নিয়েও কড়া নিয়ম করেছে কেন্দ্র। ১ সেপ্টেম্বর থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত যে সমস্ত পাইকারি ক্রেতা মাসে ১০ টনের বেশি চিনি ব্যবহার করেন, তাঁরা ১৫ দিনের বেশি চিনি মজুত রাখতে পারবেন না।
এই নিয়মের লক্ষ্য বাজারে কৃত্রিম সংকট বা অতিরিক্ত মজুতের মাধ্যমে দাম বাড়ার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা।
চিনির ঘাটতি কি সত্যিই রয়েছে?
চিনির দাম বাড়লেও শিল্পমহলের একাংশের দাবি, দেশে এই মুহূর্তে চিনির প্রকৃত ঘাটতি নেই। চিনি কলগুলিতে পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে এবং সেই মজুত দিয়ে নভেম্বর-ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানো সম্ভব হতে পারে।
এর মধ্যে নতুন উৎপাদন শুরু হয়ে গেলে বাজারে সরবরাহ আরও বাড়বে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি চিনির সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা আপাতত নেই বলেই মনে করছে শিল্পমহল।
আগেই শুরু হবে নতুন চিনির মরশুম
ইন্ডিয়ান সুগার অ্যান্ড বায়োএনার্জি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন নতুন উৎপাদন মরশুম নির্ধারিত সময়ের চেয়ে ১৫ থেকে ২০ দিন আগে শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অ্যাসোসিয়েশনের হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শেষে পুরনো মরশুম শেষ হওয়ার সময় দেশে প্রায় ৪০ লাখ টন চিনি মজুত থাকতে পারে। অক্টোবরে প্রায় ২৪ থেকে ২৫ লাখ টন চিনি ব্যবহৃত হতে পারে। এরপরও প্রায় ১৫ লাখ টন মজুত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
নতুন মরশুম ১৫ থেকে ২০ অক্টোবরের মধ্যে শুরু হতে পারে। তখন চিনি কলগুলি ফের উৎপাদনে ফিরলে বাজারে সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কেন আচমকা বাড়ল চিনির দাম?
চিনির দাম বৃদ্ধির পিছনে উৎপাদন এবং সরবরাহ সংক্রান্ত একাধিক কারণ রয়েছে। বিশেষ করে মহারাষ্ট্র ও কর্নাটকে উৎপাদন কম হওয়ায় বাজারে সরবরাহ নিয়ে চাপ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সেপ্টেম্বরে চিনি রফতানি বন্ধ করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট মহলে জানানো হয়েছে।
পরবর্তী মরশুমের জন্য প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ লাখ টনের বাফার স্টক রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে। এর পাশাপাশি বিদেশ থেকে ১০ লাখ টন চিনি আনার সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে বাজারে সরবরাহ আরও বাড়তে পারে।
ফলে কেন্দ্রের এই পদক্ষেপ এবং আগাম নতুন উৎপাদন শুরু—দুইয়ের প্রভাবেই আগামী কয়েক সপ্তাহে চিনির বাজারে দামের চাপ কিছুটা কমতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে খুচরো বাজারে সেই প্রভাব ঠিক কতটা এবং কত দ্রুত পড়বে, তা নির্ভর করবে আমদানি, মজুত এবং নতুন মরশুমের উৎপাদনের গতির উপর।







