জলবায়ু পরিবর্তন এবং ক্রমবর্ধমান জলের চাহিদার কারণে ভবিষ্যতে বিশ্বজুড়ে গুরুতর জলের সংকট দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করলেন বিজ্ঞানীরা। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, এই শতাব্দীর শেষ নাগাদ পৃথিবীর প্রায় ৭৪ শতাংশ খরাপ্রবণ অঞ্চলে নজিরবিহীন জলের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। গবেষকদের মতে, অনেক এলাকায় এই সংকটের প্রথম ধাক্কা চলতি দশক বা আগামী দশকেই দেখা দিতে পারে।
বিজ্ঞান সাময়িকী Nature Communications-এ প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তথাকথিত ডে জিরো খরা পরিস্থিতির ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে। এই পরিস্থিতি তৈরি হয় যখন একটি অঞ্চলের মোট জলের চাহিদা তার টেকসই সরবরাহের চেয়ে বেশি হয়ে যায়।
গবেষকদের ব্যাখ্যায়, ডে জিরো খরা সাধারণ খরার মতো নয়। এখানে একাধিক সমস্যা একসঙ্গে দেখা দেয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। যেমন বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া, নদীর জলের প্রবাহ হ্রাস, দ্রুত বাড়তে থাকা জলের ব্যবহার এবং জলাধারগুলির জলের স্তর দ্রুত কমে যাওয়া। এই সব কারণ মিলেই তৈরি হয় এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে জলাধার প্রায় খালি হয়ে যেতে পারে এবং জলের সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
গবেষক দল এই সম্ভাব্য সংকট বোঝার জন্য শতাধিক জলবায়ু মডেল বিশ্লেষণ করেছেন। উচ্চ মাত্রার কার্বন নিঃসরণের সম্ভাব্য পরিস্থিতি ধরে এই বিশ্লেষণ করা হয়। তাঁদের হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীর খরাপ্রবণ স্থলভাগের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এলাকায় ২১০০ সালের মধ্যে নজিরবিহীন জলের সংকট দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকায় ২০২০ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যেই প্রথম বড় সংকটের ঘটনা ঘটতে পারে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন বড় জলাধারের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে প্রায় ১৪ শতাংশ জলাধারে এমন তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী খরা দেখা দিতে পারে, যা সেগুলিকে প্রায় সম্পূর্ণ খালি করে দিতে পারে।
বিশেষ করে কিছু অঞ্চলকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেছেন গবেষকরা। এর মধ্যে রয়েছে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমাঞ্চল। এসব অঞ্চলে খরা দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে এক খরা শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি খরা শুরু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে জলাধার, ভূগর্ভস্থ জল, পরিবেশ এবং স্থানীয় অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের জন্য খুব কম সময় পাওয়া যাবে।
এই সংকটের প্রভাব পড়তে পারে কোটি কোটি মানুষের জীবনে। গবেষকদের অনুমান, বিশ্বের প্রায় ৭৫ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষ এমন অঞ্চলে বসবাস করতে পারেন যেখানে প্রথমবারের মতো ডে জিরো খরা দেখা দেবে। বর্তমান বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় ৯ শতাংশ এর মধ্যে পড়তে পারে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের বাসিন্দারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
গবেষণায় বলা হয়েছে, যদি বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রায় দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যায়, তবে প্রায় ৪৮ কোটি ৮০ লক্ষ মানুষ নতুন করে এই সংকটপূর্ণ অঞ্চলে বসবাস করতে পারেন। এর মধ্যে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল ছাড়াও ভারত, চীন এবং অস্ট্রেলিয়ার দ্রুত বর্ধনশীল শহরাঞ্চলও রয়েছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজ্ঞানীরা এখন থেকেই পরিকল্পিত পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কৃষি, শিল্প এবং গৃহস্থালি সব ক্ষেত্রেই জলের অপচয় কমানো, জলাধার ব্যবস্থাপনার উন্নতি করা এবং বিকল্প জলের উৎস তৈরি করা জরুরি বলে মনে করছেন তারা। বৃষ্টির জল সংরক্ষণ, সমুদ্রের জল বিশুদ্ধকরণ এবং ব্যবহৃত জলের পুনর্ব্যবহার বাড়ানোর মতো উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
গবেষকদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণতা যতটা সম্ভব কম রাখা এবং টেকসইভাবে জলের ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতের সবচেয়ে ভয়াবহ জলের সংকট অনেকটাই এড়ানো সম্ভব।






