পরিবারে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের অন্যতম বড় কারণ একটি প্রচলিত ধারণা—বাবার মৃত্যুর পর বড় ছেলেই নাকি সমস্ত সম্পত্তির মালিক হন। অনেকেই এটাকেই আইনের নিয়ম বলে মনে করেন। কিন্তু বাস্তবে ভারতীয় উত্তরাধিকার আইনে এমন কোনও সাধারণ বিধান নেই। কে কতটা সম্পত্তি পাবেন, তা নির্ভর করে একাধিক আইনি বিষয়ের উপর।
আইন অনুযায়ী, সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে প্রথমেই দেখা হয় সেটি পৈতৃক নাকি স্ব-অর্জিত সম্পত্তি। পাশাপাশি মৃত ব্যক্তি কোনও বৈধ উইল করে গিয়েছেন কি না এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ক্ষেত্রে কোন উত্তরাধিকার আইন প্রযোজ্য, তাও গুরুত্বপূর্ণ।
যদি কোনও ব্যক্তি উইল না করে মারা যান, তাহলে হিন্দু উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী তাঁর সম্পত্তি প্রথম শ্রেণির উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ভাগ হবে। এই তালিকায় স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে এবং মা—সকলেই সমানভাবে অন্তর্ভুক্ত। ফলে শুধুমাত্র বড় ছেলে হওয়ার কারণে অতিরিক্ত কোনও আইনি সুবিধা পাওয়া যায় না।
অন্যদিকে, মৃত ব্যক্তি যদি আইনসম্মতভাবে একটি বৈধ উইল করে যান, তাহলে সেই উইল অনুযায়ীই সম্পত্তি বণ্টন হবে।
পৈতৃক এবং স্ব-অর্জিত সম্পত্তির ক্ষেত্রেও নিয়ম আলাদা। সাধারণভাবে চার পুরুষ ধরে উত্তরাধিকার সূত্রে চলে আসা অবিভক্ত সম্পত্তিকে পৈতৃক সম্পত্তি বলা হয়। এই ধরনের সম্পত্তিতে পরিবারের সহদায়িকদের জন্মসূত্রে অধিকার তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে, কোনও ব্যক্তি নিজের উপার্জনে যে সম্পত্তি কেনেন বা অর্জন করেন, তা স্ব-অর্জিত সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। এই ধরনের সম্পত্তির মালিক চাইলে বৈধ উইলের মাধ্যমে নিজের ইচ্ছামতো যে কাউকে সেই সম্পত্তি দিয়ে যেতে পারেন। তবে উইল না থাকলে উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী সম্পত্তি ভাগ হবে।
মেয়েদের সম্পত্তির অধিকার নিয়েও আইন স্পষ্ট। ২০০৫ সালে হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে সংশোধনের পর মেয়েদেরও ছেলেদের মতোই পৈতৃক সম্পত্তিতে সমান অধিকার দেওয়া হয়েছে। বিয়ে হয়ে গেলেও সেই অধিকার নষ্ট হয় না। সুপ্রিম কোর্টও একাধিক রায়ে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের বিষয়টি স্পষ্ট করেছে।
তাই পৈতৃক সম্পত্তির ক্ষেত্রে বাবা এককভাবে পুরো সম্পত্তি শুধুমাত্র একজন ছেলের নামে দিয়ে যেতে পারেন না, যদি সেখানে অন্য সহদায়িকদেরও আইনি অধিকার থাকে। তবে সম্পত্তি যদি সম্পূর্ণভাবে তাঁর স্ব-অর্জিত হয়, তাহলে বৈধ উইলের মাধ্যমে তিনি যে কোনও ব্যক্তি বা সন্তানের নামে সেই সম্পত্তি লিখে দিতে পারেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে সম্পত্তি নিয়ে পারিবারিক বিরোধ এড়াতে সময় থাকতেই বৈধ উইল তৈরি করা উচিত। পাশাপাশি সম্পত্তির সমস্ত নথি হালনাগাদ রাখা এবং মৌখিক প্রতিশ্রুতির বদলে লিখিত আইনি নথির উপর নির্ভর করাই সবচেয়ে নিরাপদ। কোনও বিরোধ তৈরি হলে আদালত পারিবারিক প্রথা নয়, আইন এবং প্রমাণের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেয়। তাই প্রয়োজন হলে অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।






