অনুকূল আবহাওয়ার জেরে এ বছর হুগলি জেলায় আলুর উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তবে উৎপাদন বৃদ্ধির এই সাফল্যই এখন চাষিদের জন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত ফলনের কারণে বাজারে আলুর দাম তলানিতে ঠেকেছে, ফলে লোকসানের আশঙ্কায় দিশেহারা কৃষকরা।
হুগলি শ্রীরামপুর সাংগঠনিক জেলার তৃণমূলের কিষাণ ও খেত মজুর সংগঠনের সভাপতি আব্দুল নাসিম মণ্ডল জানান, সাধারণত যেখানে ২৩ থেকে ২৫ লক্ষ মেট্রিক টন আলু উৎপাদন হয়, সেখানে এ বছর তা বেড়ে প্রায় ২৮ থেকে ৩০ লক্ষ মেট্রিক টনে পৌঁছেছে। কিন্তু বাজারে তার প্রতিফলন নেই। বর্তমানে মাঠ পর্যায়ে ৫০ কেজির একটি বস্তার দাম ৯০ থেকে ১৮০ টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করছে, তাতেও ক্রেতার দেখা মিলছে না।
রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের কাছ থেকে প্রতি কুইন্টাল ৯৫০ টাকা দরে আলু কেনার ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি সমবায় হিমঘরে সংরক্ষণের জন্য ৩০ শতাংশ জায়গা বরাদ্দ এবং একজন চাষির জন্য সর্বোচ্চ ৭০ বস্তা আলু রাখার সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে বাস্তবে সেই প্রক্রিয়া কার্যকর হচ্ছে না বলেই অভিযোগ উঠছে। অনেক ক্ষেত্রেই টোকেন পেলেও নির্দিষ্ট সময় মিলছে না, ফলে আলু সংরক্ষণ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।
সিঙ্গুরের কৃষক অমলেন্দু ঘোষ বলেন, মাঠে ক্রেতার অভাবে বাধ্য হয়ে আলু বাড়িতে বা হিমঘরে রাখতে হচ্ছে। যদিও সরকার কেনার কথা বলছে, কিন্তু সেই বিষয়ে এখনও স্পষ্ট কোনও উদ্যোগ চোখে পড়েনি।
একই সুর পান্ডুয়ার চাষি সুশান্ত চট্টোপাধ্যায়-এর কথাতেও। তাঁর দাবি, গত চার দশকে এমন পরিস্থিতি দেখা যায়নি। উৎপাদন ভালো হলেও বাজারে ক্রেতার অভাব তীব্র। বর্তমানে আলুর দাম ১৩০ থেকে ১৪০ টাকার মধ্যে, অন্যদিকে হিমঘরে সংরক্ষণের খরচ বস্তা পিছু প্রায় ৭০ টাকা। ফলে লাভ তো দূরের কথা, খরচই তুলতে পারছেন না অনেকেই।
চাষিদের আরও অভিযোগ, বস্তার দাম ৩৫-৩৬ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে, যা কার্যত কালোবাজারির সামিল। এতে খরচ আরও বাড়ছে। গত বছরের লোকসানের অভিজ্ঞতার কারণে ব্যবসায়ীরাও এবার আলু কিনতে অনাগ্রহী। গত বছর উচ্চ দামে কিনে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় বড় ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন তাঁরা।
এই পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও চাপানউতোর শুরু হয়েছে। বিজেপি কিষাণ মোর্চার জেলা সভাপতি সঞ্জয় পান্ডে বলেন, চাষিদের অভিযোগ যথার্থ। হিমঘরে আলু ভরার জন্য সময়মতো সুযোগ না পেলে বৃষ্টিতে ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যার দায় সরকারকেই নিতে হবে। তিনি আরও দাবি করেন, এই পরিস্থিতির প্রভাব ভোটবাক্সেও পড়তে পারে।
অন্যদিকে সিপিএম নেত্রী মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় অভিযোগ করেন, মধ্যবর্তী দালালচক্র চাষিদের ক্ষতির সুযোগ নিচ্ছে এবং লাভ নিজেদের পকেটে তুলছে।
সমবায় হিমঘরগুলির তরফে জানানো হয়েছে, নির্দিষ্ট নিয়ম মেনেই আলু সংরক্ষণ করা হচ্ছে। পান্ডুয়ার এক সমবায় হিমঘরের ডিরেক্টর সত্যজিৎ ঘোষ জানান, তাঁদের স্টোরে প্রায় ১ লক্ষ ৯৯ হাজার বস্তা আলু রাখার ক্ষমতা রয়েছে। নির্দিষ্ট অনুমোদন থাকলে চাষিরা ২৫ তারিখ পর্যন্ত আলু রাখতে পারবেন। তবে প্রয়োজন হলে সময়সীমা বাড়ানোর বিষয়টি সরকারের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করবে।
সব মিলিয়ে, উৎপাদন বেশি হলেও সঠিক বাজারব্যবস্থা, সংরক্ষণ ও সরকারি উদ্যোগের ঘাটতির কারণে হুগলির আলু চাষিরা এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে। বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে—এই আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন কৃষক মহল।






