পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এমন এক ব্যক্তিত্ব, যাঁর উপস্থিতি প্রায় এককভাবেই একটি দলকে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছে। তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সর্বশক্তি নিয়োগ সত্ত্বেও বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে মমতার মোকাবিলায় পিছিয়ে পড়ে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ একাধিকবার প্রচারে এলেও, আহত অবস্থায় হুইলচেয়ারে বসে প্রচার চালানো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে রাজনৈতিক লড়াইয়ে সমানতালে টেকা কঠিন হয়ে ওঠে বিরোধীদের কাছে।
এই অবস্থান একদিনে তৈরি হয়নি। কলকাতার সাধারণ পরিবারের মেয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৭০-এর দশকে কংগ্রেসের এক সাধারণ কর্মী হিসেবে। ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি গভীর অনুরাগ এবং প্রণব মুখার্জির রাজনৈতিক ছায়ায় তাঁর প্রথম দিকের অভিজ্ঞতা তাঁকে রাজনীতির ভিত গড়তে সাহায্য করে।
১৯৫৫ সালে কলকাতার হাজরা এলাকার এক নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তার বাবা ছিলেন একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী। ছাত্রজীবন থেকেই সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত থাকা মমতা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নিজের লড়াকু মানসিকতা এবং সংগঠনের দক্ষতার জন্য নজর কেড়েছিলেন। মাত্র একুশ বছর বয়সে রাজ্য মহিলা কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ পদে ওঠা এবং পরে যুব কংগ্রেসে দায়িত্ব পাওয়া তাঁর দ্রুত উত্থানের ইঙ্গিত দেয়।

১৯৮৪ সালে যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রে সিপিএমের প্রবীণ নেতা সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে পরাজিত করে জাতীয় রাজনীতিতে আলোড়ন তোলেন তিনি। সেই জয় শুধু একটি নির্বাচনী ফল নয়, বরং নতুন এক রাজনৈতিক শক্তির আগমনের বার্তা ছিল।
পরবর্তী সময়ে ওঠাপড়া থাকলেও তিনি রাজনীতি থেকে সরে যাননি। ১৯৯১ সালে আবার লোকসভায় প্রত্যাবর্তন এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব গ্রহণ তাঁর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়ায়। পরবর্তীকালে রেলমন্ত্রী হিসেবেও কাজ করেন তিনি। ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বড় মোড়। অল্প সময়ের মধ্যেই দলটিকে পশ্চিমবঙ্গের প্রধান বিরোধী শক্তিতে পরিণত করেন তিনি।
সিঙ্গুর এবং নন্দীগ্রাম আন্দোলন তাঁর রাজনৈতিক উত্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কৃষিজমি রক্ষার আন্দোলনে সরাসরি নেতৃত্ব দিয়ে তিনি সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দেন। নন্দীগ্রামের ঘটনার পর বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে জনমত দ্রুত বদলাতে শুরু করে, যার সুফল পায় তৃণমূল কংগ্রেস।
২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে সাফল্যের পর ২০১১ সালে বামফ্রন্টের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসে তৃণমূল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হন রাজ্যের প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী। এরপর ২০১৬ এবং ২০২১ সালেও জয় ধরে রেখে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান আরও মজবুত করেন তিনি। যদিও একুশের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রামে শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে ভোটে জয়ী হতে পারেননি। পরে ভবানীপুর কেন্দ্রে উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে মুখ্যমন্ত্রী হন। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে ফের ভবানীপুর কেন্দ্রেই প্রার্থী হয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এখন দেখার মমতা ম্যাজিক কতটা কাজ করে এই নির্বাচনে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাফল্যের মূল রহস্য তাঁর লড়াই করার মানসিকতা এবং মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ক্ষমতা। কল্যাণমূলক নীতির ওপর জোর দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছনোর কৌশল তাঁকে আলাদা করে চিহ্নিত করেছে। যদিও শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি থেকে আরজি করের ঘটনায় অনেকটাই ব্যাকফুটে তৃণমূল। এখন দেখার গণদেবতা ঘাসফুলে সন্তুষ্ট হয় কিনা। যদিও ভোটের আগে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, ইমাম-পুরোহিতদের ভাতা বৃদ্ধি, যুবসাথী (বেকার ভাতা)-এর মতো প্রকল্পের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ভোটব্যাঙ্কগুলি ধরে রাখার চেষ্টা চালাচ্ছেন তৃণমূল নেত্রী। তাছাড়া, শাসনক্ষমতায় থেকেও বারবার নিজেকে বিরোধী হিসেবেই তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন, সেটা SIR ইস্যু হোক বা গ্যাসের সংকট। বারবার মানুষের কাছে ন্যারেটিভ গঠন করতে চেয়েছেন, এই লড়াই— দিল্লির বিরুদ্ধে বাংলার লড়াই। এখন দেখার, চতুর্থবার জয়ের রেকর্ড ধরে রাখতে পারেন কিনা ‘লড়াকু নেত্রী’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।





